হামাস বিভিন্ন সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে 'বর্ণবাদী', 'বিশৃঙ্খলার রেসিপি' এবং গাজার জন্য 'অবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি'র মানুষ বলে আখ্যা দিয়ে এসেছে। তবে গত মাসে এক নজিরবিহীন ফোন কল তাদের ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। হামাস ভেবেছে, জিম্মি বিনিময়ের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রধান সুবিধা ছেড়ে দিলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো ইসরায়েলকে একটি শান্তি চুক্তিতে ধরে রাখতে সক্ষম হবেন। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
দুই ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, গত সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোনে নিয়ে তাকে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন ট্রাম্প। কারণ, দোহায় হামাসের রাজনৈতিক নেতাদের আবাসস্থলে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল।
কাতারে বোমা হামলার বিষয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা হামাসকে এই বিশ্বাস জুগিয়েছে যে, তিনি নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম এবং গাজায় যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে আন্তরিক। এ কারণে, হামাস ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া বুধবারের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিটির ফলে হামাস ইসরায়েলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহারের চুক্তি ছাড়াই জিম্মিদের মুক্তি দিতে সম্মত হয়েছে।
অন্যান্য হামাস কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া। তাদের আশঙ্কা, জিম্মিদের মুক্তি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েল সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করতে পারে, যেমনটা জানুয়ারির যুদ্ধবিরতির পরেও হয়েছিল। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং আঞ্চলিক হেভিওয়েটদের উপস্থিতিতে হামাস আশ্বস্ত হয় যে, যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এগিয়ে যাবে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি গত শুক্রবার কার্যকর হয়েছে। এ চুক্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হওয়ার মতো হামাসের বেশ কিছু মূল দাবি অমীমাংসিত রয়েছে। তবুও ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা পরিকল্পনার পরবর্তী পর্যায়গুলো বাস্তবায়িত হবে— এমন আশা করছে হামাস।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হামাসের তিন কর্মকর্তাসহ সাতজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা এবং পাঁচজন সোর্সের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, কাতারে ইসরায়েলের হামলা ও জুনে ইসরায়েল-ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধ সমাপ্তির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা হামাস আলোচকদের এই আস্থা দিয়েছে যে, জিম্মি মুক্তি পেলেই তিনি ইসরায়েলকে যুদ্ধ শুরু করতে দেবেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কাতারের প্রতি ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হামাসের আস্থা বাড়িয়েছে। এছাড়াও, ইসরায়েলি বিমানকে ইরান থেকে 'ফিরে যাওয়ার' ব্যাপারে ট্রাম্পের জনসমক্ষে দেয়া নির্দেশটিও হামাস লক্ষ্য করেছিল।
হামাস এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হবে বলে মনে করছে। তবে জিম্মি মুক্তি, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আংশিক প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর একটি বৃহত্তর চুক্তি হবে কিনা— তার কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত নিশ্চয়তা পায়নি। তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারীদের (কাতার, মিশর এবং তুরস্ক) মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর করেছে।
এদিকে, হামাস নেতারাও জানেন যে তাদের এই 'জুয়া' উল্টো ফল দিতে পারে। ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া জানুয়ারির যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর গাজায় ১৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যু এবং দুর্ভিক্ষের কথা হামাসের মনে আছে। তবে এবারের আলোচনার পরিবেশে হামাস অনুভব করেছে যে, ইসরায়েলিরা চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আন্তরিক এবং মধ্যস্থতাকারীদের চাপ কাজ করছে। মিশরের প্রেসিডেন্ট সিসির আমন্ত্রণে ট্রাম্পের আসন্ন মধ্যপ্রাচ্য সফর চুক্তিটিকে কার্যকর রাখতে আরো সাহায্য করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।