স্যাটেলাইট চিত্রে ফোরদোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র, তবু রয়ে গেছে সন্দেহ

'অবশ্যই ইরানের এমন পারমাণবিক স্থাপনা আছে যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি না।‘

মিডলবেরি ইনস্টিটিউটের জেফ্রি লুইস বলেন, ‘এই হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সময়সীমা কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে পারে। তবে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে পারবে না। কারণ, অবশ্যই ইরানের এমন পারমাণবিক স্থাপনা আছে যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি না।‘

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় ইরানে মাটির গভীরে ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পারমাণবিক কেন্দ্রটি পুরোপুরি ধ্বংসও হতে পারে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং কেন্দ্রটি আদৌ ধ্বংস হয়েছে কিনা তা নিয়ে রয়ে গেছে সন্দেহ। খবর রয়টার্স।

জাতিসংঘের প্রাক্তন পারমাণবিক পরিদর্শক ও ইন্সটিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রধান ডেভিড অ্যালব্রাইট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এমওপি (ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর) বোমা ব্যবহার করে মাটির মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেছে। আমার ধারণা, স্থাপনাটি ধ্বংস হয়ে গেছে।‘

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ডেকার ইভেলেথ সতর্ক করে বলেন, ‘কয়েক হাজার সেন্ট্রিফিউজ যে হলরুমটিতে রাখা হয়েছিল সেটা শক্ত মাটির নিচে, অনেকটা গভীরে। স্যাটেলাইট ছবি দিয়ে আমরা সেগুলো ধ্বংস হয়েছে কি না পরিস্কারভাবে বলতে পারছি না।‘

ইরানের কুম শহরের কাছে খাঁড়া পাহাড়ের ভেতর নির্মিত ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনাটিতে এমওপি বোমা ব্যবহার করে গভীর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে একাধিক ছিদ্র এবং চারপাশে ছড়ানো ধুলা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টিলথ বিমান হামলার আগে ইরানের ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের চিত্র ধরা পড়েছে স্যাটেলাইটে। তাতে দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রটির টানেলের প্রবেশপথ ঘিরে ছিল ব্যতিক্রমী ট্রাফিক এবং ভারী যান চলাচল। ১৬টি মালবাহী ট্রাক সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করছে ফোরদোর প্রবেশপথ বরাবর, যা সরাসরি টানেলের প্রবেশপথের দিকে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ ট্রাকগুলোর বেশির ভাগই সরিয়ে নেয়া হয় প্রায় এক কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, মূল প্রবেশপথ থেকে কিছুটা দূরে, যা ইঙ্গিত করে—তেহরান হয়তো হামলার পূর্বাভাস পেয়েছিল, যার ফলে তারা পরমাণু উপকরণ সরিয়ে নিয়েছে।

মিডলবেরি ইনস্টিটিউটের জেফ্রি লুইস বলেন, ‘এই হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সময়সীমা কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে পারে। তবে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে পারবে না। কারণ, অবশ্যই ইরানের এমন পারমাণবিক স্থাপনা আছে যেগুলো সম্পর্কে আমরা জানি না।‘

অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলি বলছেন, 'ইরান হয়ত তাদের পারমাণবিক সকল কার্যক্রমই আন্ডারগ্রাউন্ডে করছে। এর মানে মাটির নিচেই হতে হবে এমন নয়। তবে তাদের কার্যক্রম রাডারকে ফাঁকি দিতে পারছে। তাই যখনই আমরা তা সম্পূর্ণ বন্ধ করার চেষ্টা করব, ইরানের কার্যক্রম আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।‘

রয়টার্স জানাচ্ছে, ম্যাক্সারের একটি স্যাটেলাইট চিত্রে ফোরদোর পাহাড়ের নিচে ছয়টি ছোট গর্ত স্পষ্ট দেখা গেছে। ফোরদোয় ফেলা হয়েছিল ৬টি বিশাল বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমা। তারপর আবার একই স্থানেই আরো ছয়টি বিস্ফোরণ করা হয় — যা ‘ডাবল-ট্যাপ’ পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। ইরানের অন্য দুই প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্র নাতাঞ্জ ও ইসফাহানেও হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। ১০ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলও এ দুটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

অ্যালব্রাইট এক্স-এ দেয়া এক পোস্টে বলেন, এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেসের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের ইসফাহানে একটি ইউরেনিয়াম স্থাপনায় মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। তবে ইসফাহানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অ্যালব্রাইট। তিনি বলেন, এ ধরনের অস্ত্র এত গভীর ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ভেদ করতে সক্ষম নয় যেখানে ইরানের প্রধান পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রটি ফোরদোর চেয়েও গভীরে বলে ধারণা করা হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ওই সুড়ঙ্গগুলোর প্রবেশমুখে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

অ্যালব্রাইট আরো জানান, সম্প্রতি ইরান আইএইএকে অবহিত করেছে যে— তারা ইসফাহানে একটি নতুন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। অ্যালব্রাইট বলেন, ‘এই নতুন কেন্দ্রে ২,০০০ থেকে ৩,০০০ সেন্ট্রিফিউজ বসানোর কথা ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে—ওগুলো এখন কোথায়?’

আরও