ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে নামলেন শিক্ষক-অভিভাবক-শ্রমিক, আটক ৬ হাজার ছাড়িয়েছে

প্রায় ১ হাজার ৮০০টি স্কুল বন্ধ

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১৫ পুলিশ সদস্য ও ২১৫ কিশোর আহত হয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে ৬ হাজার ১০০ জনকে, যাদের প্রায় সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ শ্রেণীকক্ষের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভে নেমেছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমিকরা। মঙ্গলবার দেশটির বিভিন্ন শহরে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েছে পুলিশ। সেইসঙ্গে এখন পর্যন্ত ৬ হাজারে ১০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকালে মার্সেই, নঁত ও লিওঁসহ বিভিন্ন শহরে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেয়। রাজধানী প্যারিসে দিনের শেষ দিকে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভে আরো ৪০ হাজার মানুষ যোগ দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিন সকালে মার্সেই, নঁত ও লিওঁতে বিক্ষোভ শুরু হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে ধোঁয়া ছোড়ার ফ্লেয়ার ও বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা গেছে। এর মধ্যে ছিল—‘আমাদের পাঠ্যবইয়ের নিচে জমছে ক্ষোভ’ এবং ‘অর্থহীন স্কুল মানেই ভবিষ্যৎহীন দেশ’। স্ট্রাসবুর্গ, লিওঁ ও রেঁ শহরে বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আগুন জ্বালানোর পাশাপাশি পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।

গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এ আন্দোলন প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় উপশহরগুলো থেকে শুরু হয়। পরে তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভের বিভিন্ন পর্যায়ে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছে। বেশিরভাগ স্থানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও কোথাও কোথাও ময়লার ঝুড়িতে আগুন, যাত্রীছাউনি ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বিক্ষোভকারীরা। জবাবে পুলিশও লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও বিশেষ গুলি ছুড়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর থেকে ২৪টি স্কুলে আগুন দেয়া বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আর দেশটির উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জাতীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, মঙ্গলবার ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি অবরোধ করা হয়েছে অথবা মঙ্গলবারের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১৫ পুলিশ সদস্য ও ২১৫ কিশোর আহত হয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে ৬ হাজার ১০০ জনকে, যাদের প্রায় সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

মার্সেইয়ের ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ওসিয়েন বলেন, আমরা শুধু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চাই এবং শিক্ষিত হতে চাই। তার অভিযোগ, শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় তাদের অনেক সময় অর্থহীন বিকল্প শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালানো হয়েছে অথবা কোনো শিক্ষকই দেয়া হয়নি।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনেক শিক্ষকও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর রেঁনেতে বিক্ষোভে অংশ নেয়া শিক্ষক রোমাঁ দুবুর্গ বলেন, তিনি ও তার প্রায় ৩০ সহকর্মী সাম্প্রতিক পুলিশি সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন হলে তাদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারাও। সিজেটি ইউনিয়নের প্রধান সোফি বিনে সদস্যদের ‘উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন। গ্রিন পার্টির নেতা মারিন তোন্দেলিয়ের স্থানীয় কর্মকর্তা ও অভিভাবকদের সাদা পোশাক পরে বিক্ষোভের সময় সন্তানদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে শিশু-কিশোরদের বিক্ষোভ দমনে পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ করেছে শ্রমিক ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ফরাসি কর্তৃপক্ষের ‘অতিরিক্ত পুলিশি দমন-পীড়ন’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

অ্যামনেস্টি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট অ্যান সাভিনেল-বারা বলেন, গত সপ্তাহে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে পুলিশ কীভাবে কাঁদানে গ্যাস, লাঠি ও অন্যান্য কৌশল ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ১০টি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।

এর আগে গত সোমবার উত্তর ফ্রান্সে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতর আহত হয়। তার একটি হাত ও বাহুর অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সরকারের দাবি, ওই সময় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মেরেছিলেন।

ফরাসি সংবাদপত্র লা ভোয়া দ্য নরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের সময় ওই কিশোর একটি পুলিশ গ্রেনেড তুলে নেয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হলে তার হাত ও বাহুর অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

বুধবার তুর শহরে একটি উচ্চবিদ্যালয় অবরোধের সময় মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারায়। স্থানীয় কৌঁসুলি ক্যাথরিন সোরিতা-মিনার্ড বলেন, আঘাতের ধরন ‘ব্লাস্ট বল’ ধরনের প্রতিরোধমূলক গুলির আঘাতের সঙ্গে মিলে যায়।

এ ছাড়া প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সোমবার বিক্ষোভের সময় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের অধিকাংশ দাঁত ভেঙে যায়। তার মা সাংবাদিকদের বলেন, তার চোয়াল সেলাই করে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সে আর কথা বলতে পারছে না। স্ট্র দিয়ে খাবার খাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো সমাধানে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বিকল্প শিক্ষক দিয়ে প্রতিস্থাপন, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ স্কুল সময় পুনর্বিবেচনা এবং পুরোনো স্কুল ভবন সংস্কার।

তবে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র সাত মাস আগে এ আন্দোলন সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের ওই গুরুত্বপূর্ণ ভোটের আগে সরকার একদিকে বাজেট ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ফ্রান্সের বিপুল ঋণ ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে।

সরকার অভিযোগ করেছে, কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজ (এলএফআই) এ আন্দোলনে উৎসাহ দিচ্ছে এবং কার্যত আন্দোলন সংগঠিত করছে। দলটির বেশ কয়েকজন এমপি স্কুল অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার পর এ অভিযোগ ওঠে। দলটির প্রবীণ নেতা ও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভের প্রতি জোরালো সমর্থন জানালেও আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

আরও