মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর আতঙ্কে মালয়েশিয়ার শরণার্থীরা

মালয়েশিয়ায় শরণার্থীদের ওপর চাপ বাড়ার সময়ই তাদের সহায়তায় কাজ করা সংগঠনগুলোর সক্ষমতা কমে গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ হওয়ার পর স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সহায়তার জন্য তহবিল সংকুচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

মালয়েশিয়ায় মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদের ফোন যেন থামছেই না। প্রতিদিন শতাধিক ফোন পাচ্ছেন দেশটির শরণার্থী সম্প্রদায়ের এক নেতা রাফ। ফোনের ওপাশে একই দৃশ্য—ভয়ে কাঁদছেন মানুষ, জানতে চাইছেন কীভাবে নিজেদের রক্ষা করা যায়। ‘ওরা কাঁদছে, আমাকে কিছু একটা করতে বলছে‘, আল জাজিরাকে বলেন রাফ।

মালয়েশিয়া সরকার মঙ্গলবার প্রায় ১ হাজার ৫০০ শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে করা একটি চুক্তির আওতায় অন্তত ৫ হাজার শরণার্থীকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসা মালয়েশিয়ার এমন সিদ্ধান্তে দেশটিতে থাকা মিয়ানমারের কয়েক লাখ মানুষের মধ্যে নতুন করে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক—এরপর কাদের ফেরত পাঠানো হবে?

শরণার্থীদের ওপর অভিযানও বেড়েছে। চলতি বছরই অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অভিযানে ৫০ হাজারের বেশি শরণার্থীকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। জুনে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তির কথা জানানোর পর এসব অভিযান আরো বেড়েছে বলে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ৯ হাজার ৭০০টির বেশি অভিযান চালানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩৭টি অভিযান। বর্তমানে দেশটির অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোতে মিয়ানমারের ১০ হাজারের বেশি নাগরিক রয়েছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, মালয়েশিয়ায় ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি শরণার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজারই মিয়ানমারের নাগরিক। রয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা।

মিয়ানমার থেকে ফেরত পাঠানো প্রথম দফার প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করতে পারেননি দেশটির শরণার্থী নেতারা। তাদের ভাষ্য, ফেরত পাঠানোদের বড় অংশ মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর। তাদের অনেকের বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র থাকায় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম জটিলতা রয়েছে।

রাফ বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। কারণ মিয়ানমার তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে। দেশটির সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী। অথচ মিয়ানমারে তাদের দীর্ঘদিনের বসবাস ও স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় রয়েছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের পর কয়েক লাখ মানুষ বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যান।

মালয়েশিয়ায় শরণার্থীদের ওপর চাপ বাড়ার সময়ই তাদের সহায়তায় কাজ করা সংগঠনগুলোর সক্ষমতা কমে গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ হওয়ার পর স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সহায়তার জন্য তহবিল সংকুচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

ইউএনএইচসিআরও বৈশ্বিক অর্থসংকটে রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছর তাদের ৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারের অর্থঘাটতি রয়েছে এবং জুলাই পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ৩২ শতাংশ পাওয়া গেছে।

এদিকে মিয়ানমারে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়ছে। মঙ্গলবার প্রত্যাবাসনের এক দিন আগে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশন সুহাকাম বলেছে, দেশটি ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের পক্ষভুক্ত না হলেও কাউকে এমন স্থানে ফেরত না পাঠানোর নীতি আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ হয়ে গেছে, যেখানে তার নিপীড়ন, নির্যাতন বা গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। মঙ্গলবার ফেরত পাঠানোদের মধ্যে ২৭ শিশু ছিল বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে মালয়েশিয়া সরকারের দাবি, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের নাম মিয়ানমার সরকারের দেয়া তালিকা থেকে নেয়া হয়েছে এবং প্রত্যাবাসন ‘স্বেচ্ছায়’ হয়েছে। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, তারা এবারের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও পায়নি। ফলে সিদ্ধান্তগুলো সত্যিই স্বেচ্ছায় নেয়া হয়েছিল কিনা, তা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

মালয়েশিয়া ২০১৫ সালে শরণার্থীদের নিবন্ধনের জন্য রিফিউজি রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্ট বা ডিপিপি কর্মসূচি চালু করেছিল। শরণার্থী নেতারা বলছেন, নিবন্ধনের পাশাপাশি কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এ ব্যবস্থা তাদের জন্য কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রত্যাবাসনের ঘটনায় এ নিবন্ধন কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অ্যাসাইলাম অ্যাকসেস বলেছে, শরণার্থী নিবন্ধনের ব্যবস্থাকে যেন দ্রুত প্রত্যাবাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।

আরও