যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রস্তুত করা কিছু মূল্যায়নে অংশগ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত বিশ্লেষণও রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি এবং দায়িত্বের ক্ষেত্র নিয়ে বিরোধ চরমে পৌঁছানোর পর এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা এমন তথ্য দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তিনজন জানিয়েছেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে সিআইএ এবং অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (ওডিএনআই)-এর মর্ধে অভ্যন্তরীণ এ দ্বন্দ্ব চলছে। এর ফলে জাতীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এসব বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করেই জটিল আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবেলা করে আসছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলোর মতে, বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড গঠিত একটি টাস্কফোর্স।
জন র্যাটক্লিফ নেতৃত্বাধীন সিআইএর অসন্তুষ্টি হলো, গ্যাবার্ড গঠিত ‘ডিরেক্টরস ইনিশিয়েটিভস গ্রুপ’ প্রচলিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও গোপনীয়তা প্রত্যাহারের নিয়ম এড়িয়ে বেপরোয়া আচরণ করেছে। অন্যদিকে ওডিএনআই কর্মকর্তাদের দাবি, ধারাবাহিকভাবে গোয়েন্দা তথ্যে প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করেছে সিআইএ।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ একটি সময়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে এমন বিরোধ দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ইরানের সঙ্গে জটিল সংঘাতে জড়িত যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে চীনের সামরিক সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে দেশটি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর ১৮টি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ের জন্য জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। চলমান বিরোধ ইঙ্গিত করে, সেই সংস্কার পদক্ষেপ এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বেথ স্যানার। তার মতে, ওডিএনআই-এর দায়িত্ব হলো সব গোয়েন্দা সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করানো। সেটি না হলে সংস্থাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ হুমকি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অবশ্য ওডিএনআই-এর প্রতিবেদন ছাড়াও প্রেসিডেন্ট ও নীতিনির্ধারকদের কাছে নিজেদের গোয়েন্দা তথ্য পৌঁছে দেয়ার অন্য ব্যবস্থাও রয়েছে সিআইএর কাছে।
গত সপ্তাহে তুলসি গ্যাবার্ড ঘোষণা দেন, স্বামীর অসুস্থতার কারণে ৩০ জুন ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন।
ওডিএনআই-এর মুখপাত্র অলিভিয়া কোলম্যান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও নীতিনির্ধারকরা এখনো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সর্বোত্তম গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্লেষণ পাচ্ছেন।’
তিনি আরো বলেন, ওডিএনআই এবং এর অধীনস্থ সংস্থাগুলো প্রতিদিন সিআইএর সহকর্মীদের সঙ্গে গোয়েন্দা কার্যক্রম ও বিশ্লেষণের পুরো পরিসরে যোগাযোগ ও সহযোগিতা করে।
কোলম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওডিএনআই-এর তদারকি ক্ষমতার আওতায় ‘ডিরেক্টরস ইনিশিয়েটিভস গ্রুপ’ এবং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে রয়টার্স জানিয়েছিল, কংগ্রেসের নজরদারি বাড়ার পর গ্যাবার্ড গ্রুপটির কার্যক্রম গুটিয়ে দেন এবং সদস্যদের সংস্থার অন্যান্য বিভাগে পুনর্বিন্যাস করেন।
গ্যাবার্ডের কার্যালয়ে তৈরি করা মূল্যায়নে সিআইএর অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দুই সংস্থার পারস্পরিক অবিশ্বাসের সবচেয়ে গুরুতর কারণের অন্যতম এটি।
দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল (এনআইসি) প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনের অন্যতম অবদানকারী ছিল সিআইএ। এনআইসি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা বিশ্লেষণ সংস্থা। বিশেষ করে যুদ্ধকালীন সময়ে এসব প্রতিবেদনের গুরুত্ব অনেক বেশি।
বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি অবগত দুই সূত্র জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কাজে সিআইএ এখন আগের তুলনায় কম সহযোগিতা করছে। বর্তমানে সিআইএ এবং ওডিএনআই কার্যত দুটি পৃথক বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
গত বছর একপর্যায়ে দুই সংস্থার মধ্যে উত্তেজনার কারণে সিআইএ নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিতরণ ব্যবস্থায় এনআইসি-এর প্রতিবেদন প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। ফলে সাময়িকভাবে এসব বিশ্লেষণী প্রতিবেদনের প্রাপ্যতা সীমিত হয়ে পড়ে।
চারটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাবার্ড দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দুই সংস্থার মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। দায়িত্ব নেয়ার পর তার প্রথম পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল প্রেসিডেন্টের দৈনিক গোয়েন্দা ব্রিফ তৈরির ওপর আরো কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্রিফ প্রস্তুতের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে সিআইএ।
পরে গোয়েন্দাদের মধ্যে কথিত রাজনৈতিক পক্ষপাত খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে ‘ডিরেক্টরস ইনিশিয়েটিভস গ্রুপ’ গঠন করা হলে সম্পর্ক আরো খারাপ হয়ে যায়। এই গ্রুপটি সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত নথি প্রকাশ, ভোটিং মেশিনের নিরাপত্তা এবং কভিড-১৯-এর উৎস অনুসন্ধান নিয়েও কাজ করেছিল।
কিছু সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ সমালোচকদের অভিযোগ, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেই গ্রুপটি গঠন করা হয়েছিল।
সিআইএ কর্মকর্তাদের অপসারণ
২০২৫ সালের মে মাসে গ্যাবার্ড এনআইসি পরিচালনাকারী দুই জ্যেষ্ঠ সিআইএ কর্মকর্তাকে অপসারণ করেন। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, কর্মীদের জরিপে ওঠে আসা তথ্যানুযায়ী তারা ‘বিষাক্ত কর্মপরিবেশ’ তৈরি করেছিলেন এবং গোয়েন্দা তথ্যকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার ইতিহাস ছিল বলেই তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
তবে ওই কর্মকর্তা এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
এর পর আগস্টে গ্যাবার্ড ৩৭ জন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করেন। এ প্রক্রিয়ায় বিদেশে কর্মরত এক গোপন সিআইএ কর্মকর্তার পরিচয়ও প্রকাশ হয়ে যায়। গ্যাবার্ড অভিযোগ করেছিলেন, ওই ৩৭ জন গোয়েন্দা তথ্যকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করেছেন এবং তথ্য ফাঁস করেছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষেও তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।
সাবেক কর্মকর্তাসহ সমালোচকদের মতে, ২০১৭ সালের একটি গোয়েন্দা মূল্যায়নের প্রতিশোধ হিসেবেও এই পদক্ষেপ নেয়া হয়ে থাকতে পারে। সেখানে বলা হয়েছিল, ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সুবিধা দিতে ব্যাপক চেষ্টা করেছিল রাশিয়া।
গত মাসে এ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। ওই সময় ‘ডিরেক্টরস ইনিশিয়েটিভস গ্রুপ’-এ দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সিআইএ কর্মকর্তা সিনেটের একটি প্যানেলকে জানান, কভিড-১৯-এর উৎসসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্যে প্রবেশাধিকার দিতে সিআইএ বাধা দিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে তদন্ত চলছে।