ইসরায়েলি হামলায় নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। কয়েক দিন ধরা চলা রাষ্ট্রীয় আয়োজনে উপস্থিত থাকছেন বিদেশী অতিথিরাও। এমন প্রেক্ষাপটে প্রকাশ্যে দেখা গেল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)–এর প্রভাবশালী কমান্ডার জেনারেল আহমাদ ভাহিদিকে। খবর এপি।
এবারের আক্রমণের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন আলী খামেনি। পরপর হামলায় নিহত হন গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই। তখন আড়ালে চলে যান ভাহিদি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, খামেনির জানাজার প্রস্তুতি-সংক্রান্ত এক বৈঠকে অংশ নিয়েছেন ভাহিদি। পরে গতকাল রাতে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে খামেনির সাবেক বাসভবনের কাছে আয়োজিত একটি ছোট পরিসরের শোকানুষ্ঠানে কফিনের পাশে বসেও থাকতে দেখা যায় তাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনায় ইরানের কঠোর অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন আহমাদ ভাহিদি। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর সদস্য। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ইসরায়েলি হামলায় বাবা আলি খামেনি নিহত হওয়ার সময় আহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভাহিদিকেও সর্বশেষ গত ৮ ফেব্রুয়ারি জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল, যা ছিল ইরান যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে। যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও সরকারি শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতাকে হত্যা করে। পাশাপাশি মোজতবা খামেনিকেও হত্যার হুমকি দিয়েছে দেশটি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, তেহরানে খামেনির কম্পাউন্ডের হুসেইনিয়া প্রাঙ্গণের কাছে শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম মুহূর্তে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আলি খামেনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, একটি মঞ্চের ওপর রাখা কফিনে খামেনির মরদেহ শায়িত ছিল। কফিনের সামনে সারিবদ্ধভাবে লাল টিউলিপ ফুল এবং ছাদ থেকে কাগজের তৈরি প্রজাপতি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
কালো পোশাক পরা ব্যক্তিদের ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধে স্বজন হারানো পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তারা নিজেদের স্কার্ফ ও অন্যান্য সামগ্রী কফিনের সঙ্গে স্পর্শ করিয়ে দেয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের দিকে ছুড়ে দেন। ইরানে এটি একটি প্রচলিত ধর্মীয় রীতি।
পরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, খামেনির কফিনটি লাল রঙের একটি পতাকায় আচ্ছাদিত। সাদা ক্যালিগ্রাফিতে তাতে লেখা ছিল ‘ইয়া হুসেইন’—যা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতি ইমাম হুসেইনের শাহাদাতের স্মরণে ব্যবহৃত শিয়া আনুষ্ঠানিকতা।
পতাকাটি এর আগে ছিল ইরাকের কারবালা শহরের স্বর্ণগম্বুজবিশিষ্ট ইমাম হুসেইনের মাজারে। এ লাল পতাকা ঐতিহ্যগতভাবে অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তির ঝরে যাওয়া রক্ত এবং তার প্রতিশোধ নেয়ার আহ্বানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজ সকালে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিন কাঁধে করে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে নিয়ে আসেন। সেখানে ধর্মীয় নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিদেশী অতিথিরা খামেনির কফিনের পাশাপাশি তার নিহত পরিবারের অন্য সদস্যদের কফিনের প্রতিও শেষ শ্রদ্ধা জানান। নিহতদের মধ্যে তার ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদি গোলপায়েগানিও রয়েছে।
আগামীকাল ইরানে খামেনির কয়েক দিনের রাষ্ট্রীয় জানাজা শুরু হবে। পরে তার মরদেহ ইরানের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরাকের কয়েকটি শহরেও নেয়া হবে।
এ উপলক্ষে রাজধানী তেহরানে সড়ক, আকাশপথ এবং দৈনন্দিন কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ।