বৈদ্যুতিক সার্কিটে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের টানেলিং ও এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী

রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস জানিয়েছে, বৈদ্যুতিক সার্কিটে ‘ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং’ এবং ‘এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন’-এর যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাদের এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

বৈদ্যুতিক সার্কিটে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের টানেলিং ও শক্তির কোয়ান্টাইজেশন প্রমাণ করায় এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ. দেভোরে এবং জন এম. মার্টিনিস।

বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) বিকাল পৌনে ৪টায় সুইডেনের স্টকহোম থেকে এ বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

সংস্থাটি জানিয়েছে, বৈদ্যুতিক সার্কিটে ‘ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং’ এবং ‘এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন’-এর যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাদের এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি সিস্টেমের সর্বাধিক আকার কত হতে পারে, যেখানে এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রভাব প্রদর্শন করতে পারে। এ বছর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানীরা এমন একটি ইলেকট্রিকাল সার্কিট বা বৈদ্যুতিক বর্তনী নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যা হাতে ধরে রাখা সম্ভব। আর সেই বর্তনীতেই তারা কোয়ান্টাম টানেলিং এবং কোয়ান্টাইজড শক্তি স্তরের মতো কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল প্রভাব প্রদর্শন করে দেখিয়েছেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যগুলো ম্যাক্রোস্কোপিক স্কেলেও বাস্তব করে তোলা যেতে পারে।

সাধারণত, যখন প্রচুর সংখ্যক কণা একটি সিস্টেমে জড়ো হয়, তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল প্রভাবগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, অপেক্ষাকৃত বড় সিস্টেমেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম কার্যকর থাকতে পারে।

এই বছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার গেছে এমন তিন বিজ্ঞানীর হাতে, যারা প্রমাণ করেছেন—কোয়ান্টাম মেকানিক্সের রহস্য শুধু পরমাণু বা ক্ষুদ্র কণার জগতে সীমাবদ্ধ নয়, তা হাতে ধরা যায় এমন বড় যন্ত্রেও কার্যকর হতে পারে।

১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ. দেভোরে এবং জন এম. মার্টিনিস সুপারকন্ডাক্টর দিয়ে তৈরি একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটে একাধিক পরীক্ষা চালান। সার্কিটে দুটি সুপারকন্ডাক্টরকে পৃথক করেছিল একটি পাতলা অপরিবাহী স্তর, যা ‘জোসেফসন জাংশন’ নামে পরিচিত। এই সার্কিটে প্রবাহিত ইলেকট্রনগুলোর সম্মিলিত আচরণ ছিল এমন, যেন পুরো সিস্টেমটি একটিমাত্র কণার মতো কাজ করছে।

এই সিস্টেম প্রথমে এমন এক অবস্থায় ছিল যেখানে ভোল্টেজ ছাড়াই কারেন্ট প্রবাহিত হয়—এ যেন এক প্রাচীরের পেছনে আটকে থাকা অবস্থা। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায়, সিস্টেমটি সেই প্রাচীর পেরিয়ে যায় ‘কোয়ান্টাম টানেলিং’-এর মাধ্যমে, এবং ভোল্টেজের উপস্থিতি তার পরিবর্তিত অবস্থার সাক্ষ্য দেয়।

গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই সার্কিট কেবল নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি শোষণ বা নির্গত করতে পারে—যা কোয়ান্টাইজড শক্তিস্তরের বৈশিষ্ট্য, ঠিক যেমনটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণীতে ছিল।

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ওলে এরিকসন বলেন, এক শতাব্দী পুরোনো কোয়ান্টাম মেকানিক্স এখনো আমাদের নতুন নতুন চমক দিচ্ছে। এটি শুধু মুগ্ধকর নয়, অত্যন্ত কার্যকরও—কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তির ভিত্তিই হলো কোয়ান্টাম তত্ত্ব।

কম্পিউটারের মাইক্রোচিপে ব্যবহৃত ট্রানজিস্টর যেমন বিদ্যমান কোয়ান্টাম প্রযুক্তির উদাহরণ, তেমনি এই গবেষণা ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং সেন্সর প্রযুক্তি উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

আরও