ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রায় বিপর্যস্ত মরুর ‘জাহাজ’ উট, সংকটে আফ্রিকার যাযাবর জীবন

সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় উট শরীরের তাপমাত্রা ওঠানামার মাধ্যমে ঘাম কমিয়ে পানি সংরক্ষণ করতে পারে। ঘন প্রস্রাব, শুষ্ক মল এবং মোটা লোমও তাদের পানিশূন্যতা কমাতে সহায়তা করে। তবে তাপমাত্রা ৪১ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আফ্রিকার শুষ্ক ও উষ্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম ভরসা ‘‌মরুর জাহাজ’ খ্যাত উট। প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ খরা ও পানির অভাব সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য এ প্রাণীকে প্রকৃতির অন্যতম অভিযোজিত জীব হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আফ্রিকাজুড়ে তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সে সহনশীল উটও এখন চরম সংকটে পড়েছে। ফলে উটনির্ভর যাযাবর জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে।

ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আফার অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ ও শুষ্ক স্থানগুলোর একটি। এখানকার যাযাবররা এখনো উটের কাফেলায় করে ডানাকিল নিম্নভূমি থেকে লবণ পরিবহন করেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে এ পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে বলে জানান স্থানীয় উটপালক আলি উমের।

প্রায় ৫০০ উটের মালিক ৪০ বছর বয়সী উমের বলেন, আমি উটগুলোর কষ্ট চোখের সামনে দেখছি। তাদের পায়ের নিচে ফোস্কা পড়ে যাচ্ছে, চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। উত্তপ্ত বালু তাদের চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে, এমনকি বসে থাকলে শরীরের লোমও ঝরে যাচ্ছে। গত এক মাসেই অতিরিক্ত গরমে তিনি আটটি উটশাবক হারিয়েছেন। জানালেন, আগে যে বাতাস শীতলতা এনে দিত, এখন সেই বাতাসও আগুনের মতো গরম।

বিজ্ঞানী, প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরাও তার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত। তাদের মতে, অতিরিক্ত তাপের কারণে উটের মধ্যে হিট স্ট্রেস, পানিশূন্যতা, ক্লান্তি, রোগ সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার বাড়ছে। পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে পানি, ঘাস ও ছায়াযুক্ত জায়গা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে।

বিশ্বের এক কুঁজওয়ালা ড্রোমেডারি উটের প্রায় ৮০ শতাংশই উত্তর আফ্রিকা ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের প্রাণি। খরা ও তীব্র গরম সহ্য করতে পারায় বহু পশুপালক গরুর পরিবর্তে উট পালনে ঝুঁকেছিলেন। তবে ২০২৫ সালে প্রকাশিত দক্ষিণ ইথিওপিয়াভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উটের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও প্রজনন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশ সোমালিয়ায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রায় ছয় হাজার যাযাবর পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খরার কারণে উটের মৃত্যুর ঘটনা প্রায় ৪৬ শতাংশ উটপালক পরিবারকে প্রভাবিত করেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তরাঞ্চলের সুল অঞ্চল, যেখানে উটের মৃত্যুহার প্রায় ৭৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরম তাপপ্রবাহই এ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী খরার মূল কারণ। উচ্চ তাপমাত্রায় মাটি ও জলাশয়ের পানি দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়, একই সঙ্গে উদ্ভিদও বেশি হারে পানি হারায়। ফলে পশুখাদ্য ও পানির সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।

কেনিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মারসাবিত কাউন্টির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা হাসান নুয়া গুইয়ো জানান, গত দুই বছরে তার এলাকায় উটের মৃত্যুহার ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে হাইপারথার্মিয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে উট নানা ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে।

হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উটের মধ্যে রোগের প্রকোপ বাড়ছে এবং দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

উত্তর আফ্রিকাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি বছর আলজেরিয়ায় প্রকাশিত এক গবেষণায় গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের সময় উটের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা বলছেন, গ্রীষ্মের চরম তাপের সময় পর্যাপ্ত পানি, অতিরিক্ত খাদ্য এবং রোগ পর্যবেক্ষণের মতো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের পর থেকে উত্তর আফ্রিকায় তাপপ্রবাহের মাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে অঞ্চলটির কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। সংস্থাটির ‘‌স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন আফ্রিকা ২০২৫’- প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উত্তর আফ্রিকা প্রতি দশকে গড়ে ০ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে উষ্ণ হয়েছে, যা মহাদেশের ছয়টি উপ-অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় উট শরীরের তাপমাত্রা ওঠানামার মাধ্যমে ঘাম কমিয়ে পানি সংরক্ষণ করতে পারে। ঘন প্রস্রাব, শুষ্ক মল এবং মোটা লোমও তাদের পানিশূন্যতা কমাতে সহায়তা করে। তবে তাপমাত্রা ৪১ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) উটস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ বেঙ্গুমি বলেন, সাহারা মরুভূমির অনেক এলাকায় এখন গ্রীষ্মে নিয়মিত ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে। পানি, উদ্ভিদ ও ছায়ার অভাবের সঙ্গে মিলিত হয়ে এ পরিস্থিতি উটের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

আলজেরিয়ার ঘারদাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদেলমাজিদ চেহমা জানান, দীর্ঘ সময় ৪১ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় থাকলে উটের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। শরীরের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং খাদ্য গ্রহণ কমে যায়। এর ফলে দুধ উৎপাদন কমে, প্রজনন সমস্যা দেখা দেয় এবং শরীরে দুর্বলতা তৈরি হয়।

পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অনেক যাযাবর এখন উত্তর ইথিওপিয়া ছেড়ে দক্ষিণাঞ্চলের তুলনামূলক সবুজ এলাকায় স্থায়ীভাবে চলে যাচ্ছেন। গবেষক ড্যানিয়েল গেলান বলেন, এটি আর মৌসুমি স্থানান্তর নয়; বরং টিকে থাকার প্রয়োজনে স্থায়ী আবাস পরিবর্তন।

আরও