দুই দশক ধরে গাজা শাসনের পর ক্ষমতা ছেড়ে দিতে প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছে হামাস। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে ফিলিস্তিনি এ ভূখণ্ডের শাসনভার গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
গতকালের এ ঘোষণায় গাজায় আংশিকভাবে কার্যকর যুদ্ধবিরতি কতটা শক্তিশালী হবে বা অবরুদ্ধ উপকূলীয় এলাকাটির চলমান মানবিক সংকট কতটা লাঘব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
হামাস জানিয়েছে, ক্ষমতা হস্তান্তরের অংশ হিসেবে তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্বও ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী একতরফাভাবে অস্ত্র সমর্পণের কোনো প্রতিশ্রুতি তারা দেয়নি।
হামাস যে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাছে শাসনভার হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে, সেটির নাম ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে জানুয়ারিতে এই কমিটি গঠিত হলেও, ইসরায়েল তাদের এখনো গাজায় প্রবেশ করতে দেয়নি। ফলে ক্ষমতা হস্তান্তর কবে এবং কীভাবে হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হামাসের এ ঘোষণা মূলত একটি প্রতীকী রাজনৈতিক পদক্ষেপ। এর লক্ষ্য হলো স্থবির হয়ে পড়া শান্তি প্রক্রিয়াকে আবার সচল করা, যাতে গাজার ২১ লাখ বেঁচে থাকা মানুষের জন্য পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তার পথ খুলে যায়।
তাদের মতে, এ পদক্ষেপের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েল-সমর্থিত সেই পরিকল্পার বিরোধিতা করা, যেখানে ত্রাণ, পুনর্গঠন এবং এনসিএজির প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গাজার মাত্র একটি ছোট অংশে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা সরাসরি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানেই বিশেষভাবে নির্মিত বসতিতে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এ পরিকল্পাকে সমর্থন দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা এটিকে কখনো ‘মানবিক নগরী’, কখনো ‘বিকল্প নিরাপদ সম্প্রদায়’ বা ‘নিউ রাফাহ’ নামে উল্লেখ করেছেন। তবে ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট এটিকে ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
হামাস প্রশাসনের প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা নিজের পদত্যাগ এবং এনসিএজির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, গাজার রাজনৈতিক শাসনে হামাসের ভূমিকা অবিলম্বে শেষ হবে। তবে এনসিএজি গাজায় পৌঁছানো পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পেশাদার দায়িত্ব পালন করে যাবেন।
আল-ফাররা বলেন, ‘সরকারি ব্যবস্থার হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর আমি গাজা উপত্যকার সরকারি কার্যক্রম তদারকি কমিটির চেয়ারম্যান এবং সরকারি জরুরি কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করছি।’
২০০৭ সালে গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর হামাস তাদের সরকারের জন্য বিভিন্ন সময়ে এই দুটি পদবী ব্যবহার করেছে।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, ‘হামাস একটি নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা আর গাজা উপত্যকার শাসনভার পরিচালনা করবে না, যাতে দখলদার বাহিনী তাদের আগ্রাসন ও গণবিধ্বংসী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত হিসেবে হামাসকে ব্যবহার করতে না পারে।’
তবে রাজনৈতিক রূপান্তরের সম্ভাবনা এখনো অনেক দূরের বলে মনে করা হচ্ছে। এনসিএজি তদারকি করছে ‘বোর্ড অব পিস’, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঠিত হয়।
কিন্তু কমিটির বর্তমান ১৩ সদস্য—যাদের বেশির ভাগই বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি পেশাজীবী জানুয়ারিতে একত্রিত হওয়ার পর থেকে কায়রোয় আটকে আছেন তারা। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি।
এনসিএজির চেয়ার আলি শাআত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সক্ষমতা পাওয়া মাত্রই জাতীয় দায়িত্ব পালনের জন্য কমিটি পুরোপুরি প্রস্তুত।’