বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় স্টক ফটো সাইটগুলোয় এখন ভেসে বেড়াচ্ছে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও সহিংসতার দৃশ্য দেখানো এআই তৈরি ছবি—আর সেগুলোই ব্যবহার করছে কিছু আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন এনজিও। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বৈশ্বিক উন্নয়ন ও নৈতিক যোগাযোগ বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তারা এই প্রবণতাকে বলছেন ‘পভার্টি পর্ন ২.০’।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা ফেয়ারপিকচারের কর্মকর্তা নোয়া আর্নল্ড বলেন, ‘প্রায় সব জায়গায় এখন এআই নির্মিত ছবি ব্যবহার হচ্ছে—কেউ সরাসরি, কেউবা পরীক্ষামূলকভাবে।‘
বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল মেডিসিনের গবেষক আর্সেনি আলেনিচেভ জানান, তিনি এরইমধ্যে একশোর বেশি এআই নির্মিত দারিদ্র্য সংক্রান্ত ছবি সংগ্রহ করেছেন— যেগুলো ক্ষুধা বা যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রচারণায় ব্যবহৃত হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এ ছবিগুলোয় পুনরাবৃত্তি হচ্ছে দারিদ্র্যের চিরাচরিত চিত্রনাট্যের। খালি থালা হাতে শিশু, ফেটে যাওয়া মাটি, আফ্রিকান কোনো কাল্পনিক কষ্টের দৃশ্য।‘
আলেনিচেভের সংগৃহীত ছবির মধ্যে আছে — কাদাপানিতে হেঁটে যাওয়া শিশু, কনে সাজা এক আফ্রিকান কিশোরীর চোখ বেয়ে নেমেছে অশ্রু, কিংবা শ্বেতাঙ্গ স্বেচ্ছাসেবক ও কৃষ্ণাঙ্গ শিশুর চিত্র—যা বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি জিইয়ে রাখছে বলে সমালোচনা উঠেছে।
জনপ্রিয় সাইট অ্যাডোবি স্টক ফটো ও ফ্রিপিকে এখন এমন ডজনখানেক ছবি বিক্রি হচ্ছে, যেগুলোর শিরোনাম হিসেবে দেখা গেছে ‘শরণার্থী শিবিরে এক শিশুর ছবি’ বা ‘আফ্রিকান গ্রামে চিকিৎসা দিচ্ছেন শ্বেতাঙ্গ চিকিৎসক’ এর মতো চর্চিত বিষয়। এসব ছবির মূল্য প্রায় ৬০ পাউন্ড পর্যন্ত যায়।
এআই নির্মিত দারিদ্র্যের ছবিতে পক্ষপাতদুষ্টতা এবং প্রথাগত ধারণাকে আরো বাড়িয়ে তোলার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ছবি- ফ্রিপিক (ইলাস্ট্রেশন)
ফ্রিপিকের প্রধান নির্বাহী হোয়াকিন অ্যাবেলা অবশ্য বলেন, এ ধরনের কৃত্রিম ছবি প্রচারের দায়-দায়িত্ব ব্যবহারকারীর, প্ল্যাটফর্মের নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ছবির ক্রেতাদের যেমন চাহিদা, সেটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।‘
এ বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের নেদারল্যান্ডস শাখা বাল্যবিবাহবিরোধী এক ভিডিওতে এআই নির্মিত ছবি ব্যবহার করেছিল। একই বছর জাতিসংঘও সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রকাশ করেছিল এআই নির্মিত ভিডিও। পরে সমালোচনার মুখে তা সরিয়ে নেয়া হয়।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের এক মুখপাত্র পরে বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘তথ্যের সত্যতা ও বাস্তবতার সীমা মিশিয়ে ফেলেছিল সেই ভিডিও। এআই ব্যবহারের অনুপযুক্ত উদাহরণ হিসেবে আমরা সেটি সরিয়ে নিয়েছি।‘
সত্যতা ও বাস্তবতা হুমকির মুখে পড়া নিয়ে নৈতিকতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কেট কারডল বলেন, ‘আমরা এত বছর ধরে বাস্তব জীবনের মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য লড়েছি। এখন সেই লড়াই ছড়িয়ে পড়ছে ভার্চুয়াল জগতেও।‘
গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এআই দিয়ে তৈরি পক্ষপাতদুষ্ট এ ধরনের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে পরবর্তী প্রজন্মের এআই মডেল প্রশিক্ষণের সময় বৈষম্য আরো বাড়তে পারে।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা এ বছর থেকে নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে যাতে কোনো শিশুকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ব্যবহার না করা হয়। পূর্বে ব্যবহৃত ছবিগুলো ব্যবহারের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা।
সামগ্রিক বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ছবি সম্পাদনার সবচেয়ে জনপ্রিয় সফটওয়্যার অ্যাডোবি।