তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ইরানকে ‘জঘন্য’, ‘অসুস্থ’ ও ‘মিথ্যাবাদী’ বলে আখ্যা দেন। সেই সঙ্গে স্পষ্ট জানান, তেহরানের সঙ্গে তিনি আর কোনো ধরনের লেনদেনে যেতে আগ্রহী নন। প্রয়োজনে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। খবর রয়টার্স।
গত মাসে ১৪ পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল আলোচিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি। তবে চুক্তিটির কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গতকাল ন্যাটো সম্মেলনে ইরান বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় ট্রাম্পের কাছে সাংবাদিকরা যুদ্ধবিরতি বিষয়ে জানতে চান। তাদের প্রশ্ন, সমঝোতা স্মারকটি মুখ থুবড়ে পড়েছে কিনা?
জবাবে ট্রাম্প একে অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রশ্ন আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমি তাদের সঙ্গে আর কোনো লেনদেন করতে চাই না, তারা “জঘন্য”। তারা “অসুস্থ মানুষ” এবং অসুস্থ মানুষেরা তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা “নৃশংস ও সহিংস প্রকৃতির” লোক।’
ট্রাম্প আরো বলেন, ‘তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে তারা সেটি ব্যবহার করত। আমার বিবেচনায়, সব শেষ হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করা মানে শুধুই সময়ের অপচয়। তারা “মিথ্যাবাদী”।’
মার্কিন আলোচক স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের বিষয়ে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আমার কাছেই আসতে হবে।’
তার মতে, এ মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করা মানে শুধুই সময়ের অপচয়। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আবারো হামলা চালাবে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এ কূটনৈতিক বিচ্ছেদের আবহেই দুই দেশের মধ্যে নজিরবিহীন পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চলেছে। সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার, হরমুজ প্রণালি ও এর কাছাকাছি অঞ্চলে তিনটি অজ্ঞাত তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতকে কেন্দ্র করে। এ হামলার জন্য ওয়াশিংটন সরাসরি ইরানকে দায়ী করার পর দুই দেশের মধ্যকার সুতোয় ঝোলানো সম্পর্কের অবসান ঘটে। সেই সঙ্গে মঙ্গলবার গভীর রাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি ছিল ইরানের ওপর ‘খুবই কঠোর’ আঘাত। এ হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ৬০টির বেশি নৌযান, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার স্থাপনা এবং জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়।
মার্কিন এ হামলার জবাবে ইরানও বসে থাকেনি; তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ৮৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে পাল্টা হামলা চালায়। আইআরজিসি দাবি করেছে, এ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তারা একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনও ভূপাতিত করেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের বহিরাগত হস্তক্ষেপ তেহরান মেনে নেবে না এবং যেকোনো মার্কিন পদক্ষেপের জবাবে ‘বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া’ দেখানো হবে।
এদিকে সমঝোতা স্মারক ও যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের দায় নিয়ে দুই পক্ষই এখন পরস্পরকে দুষছে। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে মার্কিন হামলাকে ‘একেবারেই প্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করে ইরানকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি মূলত ভেঙেছে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে।’ তিনি অভিযোগ করেন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ, বারবার হামলার হুমকি, ইরানের তেল খাতে আবারো নিষেধাজ্ঞা আরোপ, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলি বা জায়নবাদী আগ্রাসন অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন নিজেই সমঝোতা স্মারকটি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আনুষ্ঠানিক শোক ও দাফন উপলক্ষে দেশটিতে সাতদিনের কর্মসূচি চলার মধ্যেই এ পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল। যা মধ্যপ্রাচ্যকে আবারো এক অনিশ্চিত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালির নতুন উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে।