কয়েক কিলোমিটার দূরে চীনের উপকূল—সেখানে দাঁড়িয়ে তাইওয়ানের দ্বীপ কিনমেনের এক শুক্রবার সকালে হঠাৎই সাইরেন বেজে ওঠে। মানুষ দৌড়ে নামে বেসমেন্টে, হাসপাতালে ভিড় জমে রক্তাক্ত রোগীদের। কিন্তু রক্তটা ছিল নকল, আর আহতরা ছিলেন অভিনয়শিল্পী।
এটা ছিল সাম্প্রতিক এক নাগরিক প্রতিরক্ষা মহড়া, যা এখন তাইওয়ানে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উদ্দেশ্য—চীনের সম্ভাব্য আক্রমণের মুখে কেমন করে জনগণ ও সেনাবাহিনী প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা অনুশীলন করা।
চীন তাইওয়ানকে নিজেদের একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে 'পুনরায় একত্রিত' হওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। যদিও তাইওয়ানের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চীনের আক্রমণের সম্ভাবনা কম। আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, চীন ২০২৭ সালের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারে। তাইওয়ানের সরকার বিশ্বাস করে, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে তারা যুদ্ধ এড়িয়ে চলছে।
প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই তাইওয়ানের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা সংস্কার চালু করেছেন। এর মাঝে রয়েছে আগামী বছরে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির ৩% করার পরিকল্পনা, ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৫% পর্যন্ত তোলার প্রতিশ্রুতি। এছাড়া, সেনাদের বেতন ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো হয়েছে। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদও হয়েছে দীর্ঘ। প্রতি বছরের হান কুয়াং যুদ্ধ মহড়া এখন আরো বাস্তবসম্মত; ২২ হাজার রিজার্ভ সেনা অংশ নিয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০% বেশি।
তাইওয়ানে নাগরিক প্রতিরক্ষা মহড়া। ছবি- বিবিসি
কেবল সামরিক বাহিনী নয়, সাধারণ জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতেও তাইওয়ান সরকার বিভিন্ন মহড়ার আয়োজন করছে। গত মাসে অনুষ্ঠিত 'আরবান রেজিলিয়েন্স এক্সারসাইজ' ছিল এর মধ্যে অন্যতম। এই মহড়ায় তাইওয়ানের প্রধান শহরগুলোতে বিমান হামলার মহড়া চালানো হয়, যেখানে নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়।
এই মহড়াগুলোর মাধ্যমে জরুরি সেবা প্রদানকারী দলগুলো আহতদের সরিয়ে নেয়া, আগুন নেভানো এবং বিধ্বস্ত ভবন থেকে উদ্ধার করার অনুশীলন করে। তাইওয়ান সরকারের লক্ষ্য হলো, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকরা যেন নিজেদের এবং অন্যদের রক্ষা করতে পারে, সে জন্য তাদের দক্ষ করে তোলা।
এই প্রস্তুতির বিষয়ে তাইওয়ানের জনগণের মধ্যে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ মনে করেন, চীনের হুমকির মুখে এই ধরনের মহড়া অপরিহার্য, বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধের পর। তাদের মতে, চীন তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক মহড়া চালিয়ে হুমকি বাড়িয়ে চলেছে।
তবে, অনেক তাইওয়ানবাসী এই হুমকিকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। তাদের মতে, চীন যদি সত্যিই হামলা করতে চাইতো, তাহলে এতদিনে তা করে ফেলতো। কিনমেন দ্বীপের মতো চীনের খুব কাছে অবস্থিত এলাকায় এই মনোভাব আরো বেশি প্রবল। সেখানকার মানুষ মনে করে, চীন এবং তাইওয়ান 'একই পরিবার'। তাই চীন সাধারণ জনগণের ক্ষতি করবে না।
অনেকের মতে, তাইওয়ানের শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার কারণে চীন আক্রমণ করবে না। তারা বিশ্বাস করে, আক্রমণ করলে চীনের লাভ হবে না, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া আসবে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই এবং তার দল, ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) চীনের সম্ভাব্য হুমকিকে বারবার তুলে ধরছেন। অন্যদিকে, তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাং অভিযোগ করছে যে, সরকার রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য জনগণকে ভয় দেখাচ্ছে।
এই বিতর্ক সত্ত্বেও, তাইওয়ান সরকার সামরিক ও বেসামরিক উভয় স্তরেই নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার করে চলেছে। তারা শুধু সামরিক আক্রমণের জন্যই নয়, চীনের পক্ষ থেকে আসা গুজব এবং মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধেও প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা তাইওয়ানের সমাজের বিভেদ বাড়াতে পারে।