বিদেশে নজরদারি, গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনার মতো লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদ্য প্রকাশিত ‘২০২৬ পারফরম্যান্স প্রোগ্রাম’ শীর্ষক নথিতে এ রূপান্তরের কার্যকর রূপরেখা পাওয়া যাচ্ছে। এ প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অগ্রাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য এবং কার্যক্ষমতার সূচক সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে।
চলতি বছরের অগ্রাধিকার কর্মসূচির সঙ্গে গত বছরের নীতিমালায় বড় পার্থক্য দেখা গেছে। নতুন নীতিমালার ভাষা এবং কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারে প্রথাগত কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বদলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার স্বার্থেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তারা ভূরাজনৈতিক নীতিনির্ধারক হওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হাকান ফিদান দায়িত্ব নেন ২০২৩ সালের জুনে। এর আগে দীর্ঘ ১৩ বছরেরও বেশি সময় তিনি দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মিল্লি ইস্তিখবারাত তেশকিলাতির (এমআইটি) প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অধীনে গোয়েন্দা সংস্থাটির বৈদেশিক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে তিনি মন্ত্রণালয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর পাশাপাশি তুর্কি দূত, কূটনীতিক এবং দূতাবাস কর্মীদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন। এছাড়া তুর্কি ডায়াস্পোরা ও প্রবাসী মুসলিমদের মধ্যে নতুন গুপ্তচর কর্মী নিয়োগের তৎপরতাও তার অধীনে জোরদার হয়। ফিদান প্রয়োজনে বিদেশে গুপ্তহত্যা ও অপহরণের অনুমতি দেন এবং তথ্য সংগ্রহে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনও অনুমোদন পায়। বিশেষ প্রয়োজনে মোতায়েনের জন্য সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিশেষ বাহিনীও গঠন করেন তিনি।
মন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর ফিদান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নীতিতে গোয়েন্দা ও গুপ্তচরবৃত্তির বিভিন্ন কৌশল-কার্যক্রম যুক্ত করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রূপান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে চমকপ্রদ পরিবর্তনটি চলতি বছরই দেখা গেছে। সদ্য প্রকাশিত পারফরম্যান্স প্রোগ্রামের নথির প্রথম পৃষ্ঠায় ফিদান স্বাক্ষরিত নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশটি কূটনীতি পরিচালনার মাধ্যমে সংঘাত নিরসন, মধ্যস্থতা, মানবিক সহায়তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে চায়। অথচ ২০২৫ সালের নীতি বিবৃতিতে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা, রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যকার আলোচনা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সিরিয়ার রাজনৈতিক সমঝোতায় সমর্থন দেয়া এবং তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্তর্ভুক্তির প্রসঙ্গ পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়গুলোয় জোর দেয়া হয়েছিল।
চলতি বছরের কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে একাধিকবার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, কৌশলগত অনিশ্চয়তার মঞ্চ এবং অস্তিত্ব সংকটের চ্যালেঞ্জ বলে চিত্রিত করা হয়েছে। যুক্তি দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে একটি স্বাধীন, সুসংহত এবং দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে কূটনীতিকে শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের কৌশল হিসেবে না দেখে জাতীয় শক্তির অংশ বলেই অভিহিত করেছে তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ফিদানের অধীনে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটিকে আঞ্চলিক ‘নীতিনির্ধারক’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। কূটনীতিকরা কূটনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত হাতিয়ারের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। নীতি দৃষ্টিভঙ্গির এ পরিবর্তনের মাধ্যমে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে, তাদের পরিকল্পনায় সামরিক শক্তি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৬ সালের কর্মসূচিতে তুরস্ককে ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ‘নিরাপত্তা প্রদানকারী’ রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আগের বছরের নথিতে এমন কোনো উল্লেখ ছিল না। এছাড়া কূটনীতিকে কৌশলগত যোগাযোগ করিডোর, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বারবার যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে কূটনীতিকে জাতীয় নিরাপত্তার একটি সমন্বিত অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রনীতিতে দেখানো দৃষ্টিভঙ্গিও নতুন।
পারফরম্যান্স প্রোগ্রামে ২০২৬ সালের ছয়টি প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রথমটি হলো তুরস্কের আশপাশের অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদার করা, বৈদেশিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানো। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর এই জোর দেয়া কেবল প্রশাসনিক আধুনিকায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ডিজিটাল রূপান্তর, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয় নির্বিঘ্ন করার বিষয়ও রয়েছে। এজন্য ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, দ্রুত যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে তৈরি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
এবারের পারফরম্যান্স প্রোগ্রামের সবচেয়ে বিস্ফোরক দিক হলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টরেট জেনারেল’ (আইজিজিএম)। ফিদান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর ডজনখানেক জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে এ অধিদপ্তরটি পুনর্গঠন করেন। এটি এখন দেশটির প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির অনুকরণে পরিচালিত হচ্ছে। এটি বহুপক্ষীয় কূটনীতি, ন্যাটো সংশ্লিষ্ট এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে।
এদিকে অধিদপ্তরটিকে দেয়া পারফরম্যান্স সূচকের মাধ্যমে কার্যক্রমের অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়েছে। প্রথম সূচকটিতে সন্ত্রাসে অর্থায়ন মোকাবেলায় কতগুলো আন্তর্জাতিক সমন্বয় নিশ্চিত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি আল-কায়েদা এবং ইরাক ও সিরিয়ার ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে মাথায় রেখে করা হয়েছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু দেশটির সরকার সমালোচকদের অর্থাৎ মানবাধিকার কর্মী থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের নিয়মিত ‘সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেয় এবং তাদের সম্পদ ও আয়ের উৎস নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। এভাবে অতীতে দেশটির অনেক নাগরিক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। অভিযোগ আছে, তুরস্কের সরকার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই বিগত কয়েক বছরে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও অন্য সমালোচকদের নজরদারিভুক্ত করে আর্থিক গোয়েন্দা তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়েছে।
পারফরম্যান্সের দ্বিতীয় সূচকটি আরো অস্বাভাবিক। এটি পরিমাপ করা হবে তুরস্ক যে সংস্থাগুলোকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলোর ওপর স্বনামধন্য একাডেমিক প্রকাশনা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দিয়ে। এ ধরনের সূচক ইঙ্গিত দেয় যে অধিদপ্তরের দায়িত্ব কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমন্বয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সরকারের অগ্রাধিকার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রচারণাকে এগিয়ে নেয়া। বিগত বছরগুলোর অসংখ্য প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে সরকার তার পররাষ্ট্রনীতির এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তুরস্কের বাইরের ইনফ্লুয়েন্সার, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও মিডিয়া সংস্থাগুলোকে অর্থায়ন করেছে। এভাবে দেশটির সরকার তার অগ্রাধিকারমূলক বয়ান ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অর্থায়ন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ভ্রমণ, গবেষণা মঞ্জুরি প্রদান করে। পুরো ২০২৬ সালের কর্মসূচি জুড়েই পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি, কৌশলগত যোগাযোগ এবং ডিজিটাল কূটনীতিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
তুরস্কের কূটনৈতিক নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হচ্ছে। গত এক বছরে দেশটির স্থায়ী বিদেশী মিশনের সংখ্যা ২৬১ থেকে বেড়ে ২৬৩টি হয়েছে, যার মধ্যে একটি অতিরিক্ত দূতাবাস এবং একটি নতুন স্থায়ী মিশন স্থাপন রয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে এটি সামান্য মনে হলেও এ সম্প্রসারণ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কূটনৈতিক নেটওয়ার্কের দেশ হিসেবে তুরস্কের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করেছে। তুরস্ক ক্রমেই তার দূতাবাস ও কনসুলেটগুলোকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত করেছে এবং বিদেশে কূটনৈতিক মিশনগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে গুপ্তচর নিয়োগ করছে।
২০২৬ সালের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে শক্তিশালী আদর্শিক ভাষাও বেছে নেয়া হয়েছে। আগের বছরের কর্মসূচিতে মানবিক সহায়তা, যুদ্ধবিরতি আলোচনা এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সমর্থনের ওপর জোর দেয়া হয়েছিল। নতুন কর্মসূচিতে গাজায় ইসরায়েলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দেয়া, জেরুজালেম রক্ষা, ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সমর্থনে ইসলামিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংগঠিত করার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে সিরিয়া নীতিতে শরণার্থী প্রত্যাবর্তন সহজ করা ও রাজনৈতিক উত্তরণে সহায়তার অবস্থান থেকে সরে এসে তুরস্ক পুনর্গঠন, রাষ্ট্রের সুসংহতকরণ এবং দেশটির আন্তর্জাতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারে জোর দিয়েছে। ফলে মন্ত্রণালয়টি কূটনীতিতে নিবেদিত আমলাতন্ত্রের চেয়ে তুর্কি রাষ্ট্রীয় শক্তির বহুবিধ মাত্রার সমন্বয়কারী একটি কৌশলগত সদর দপ্তরের মতো কাজ করছে।
এ রূপান্তরের মাধ্যমে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমন সব অপারেশনাল দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যা ঐতিহ্যগতভাবে গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটি পালন করত। মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব পরিকল্পনা নথিগুলো প্রমাণ করে যে কীভাবে কূটনীতিকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একটি বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে একীভূত করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকেই যে হাকান ফিদান এ কর্মসূচি নির্ধারণ করেছেন তা অনেকটাই স্পষ্ট।
[নরডিক মনিটর ও মিডল ইস্ট ফোরামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে রচিত]