দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

ইরানে আসছে ‘ইসলামিক রিপাবলিক ২.০’: কতটা সুখকর এই পরিবর্তন

‘বাইরের শক্তি দিয়ে কোনো দেশের ভাগ্য বদলে দেয়া যায় না।‘

আগের ধর্মীয় শাসনকাঠামো যখন ভেতর থেকে জীর্ণ হয়ে পড়েছিল, তখন এই যুদ্ধ যেন তাদের নতুন জীবনদান করল। ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির উত্থান এই পরিবর্তনকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। মোজতবা হয়তো তার বাবার মতো ক্যারিশম্যাটিক নন, কিন্তু তার ভেতরে কাজ করছে এক তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা।

‘এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?’—গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওয়াশিংটন থেকে তেহরান পর্যন্ত প্রতিটি নীতি-নির্ধারণী টেবিলে এই একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে ইরান যুদ্ধের বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে একটি নিষ্ঠুর সত্য বেরিয়ে আসে— এই যুদ্ধের কোনো সহজ সমাপ্তি নেই। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কোনো একটি সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি হবে, হরমুজ প্রণালীতে ট্যাঙ্কার চলাচল আবার শুরু হবে এবং মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমানের গর্জন থামবে। কিন্তু সামরিক সাফল্য আর রাজনৈতিক বিজয়ের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, তা এই যুদ্ধ আরো একবার প্রমাণ করে দিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এই যুদ্ধকে একটি বড় জয় হিসেবে ঘোষণা করবেন। যেমনটা ইসরায়েল গাজা বা লেবাননে দশকের পর দশক ধরে করে আসছে। তারা প্রতিবারই তাদের আকাশছোঁয়া সামরিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করে শত্রুকে বিধ্বস্ত করেছে, কিন্তু শত্রু দমে যায়নি। মার্কিন বিমান বাহিনীর নিখুঁত হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলো গুঁড়িয়ে গেছে এবং নৌবাহিনী ও গোয়েন্দা কাঠামোর বড় অংশ অকেজো হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই সামরিক সাফল্য কি ইরান সরকারকে হটাতে পেরেছে? উত্তরটি হলো—না। শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। সিনিয়র সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মারা গেছেন, কিন্তু তাদের জায়গা পূরণ করে নতুন কেউ সামনে এসেছে।

বিশ্ব এখন এক নতুন বাস্তবতার সাক্ষী হতে যাচ্ছে, যাকে বলা যায় ‘ইসলামিক রিপাবলিক ২.০’। আগের ধর্মীয় শাসনকাঠামো যখন ভেতর থেকে জীর্ণ হয়ে পড়েছিল, তখন এই যুদ্ধ যেন তাদের নতুন জীবনদান করল। ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির উত্থান এই পরিবর্তনকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। মোজতবা হয়তো তার বাবার মতো ক্যারিশম্যাটিক নন, কিন্তু তার ভেতরে কাজ করছে এক তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা। যুদ্ধের ফলে তার পরিবার এবং নিকটজনকে হারানোর যে শোক, তা তাকে আরো কঠোর করে তুলেছে। এখন ইরানের শাসনব্যবস্থা কেবল মোল্লাতন্ত্র নয়, বরং তা এখন ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড (আইআরজিসি) এবং ব্যবসায়িক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর এক অদ্ভুত কিন্তু শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে।

মহামতি আলেক্সান্ডার থেকে শুরু করে ভিয়েতনামের গেরিলা যোদ্ধাদের ইতিহাস আমাদের একটিই শিক্ষা দেয়—মানুষ যখন মনে করে তার হারানোর কিছু নেই এবং তার আত্মমর্যাদাই শেষ সম্বল, তখন সে অজেয় হয়ে ওঠে। ইরান কেন আত্মসমর্পণ করছে না? কারণ, এই যুদ্ধে তাদের টিকে থাকাটা এখন আর কেবল রাজনীতির বিষয় নয়, এটি তাদের জাতীয় পরিচয় ও গর্বের লড়াই। মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীরা হয়তো ভুলে গেছেন যে, কৌশলগত বোমা হামলা বা ‘স্ট্র্যাটেজিক বম্বিং’ কখনোই কোনো জাতির ইচ্ছাশক্তিকে ভাঙতে পারে না। উল্টো এটি সাধারণ মানুষের ভেতরে বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথের মতো নেতাদের আক্রমণাত্মক ভাষা—‘তারা ভেঙে পড়ছে, তাই তাদের আরো মারো’—এই ঘৃণাকে আরো ঘনীভূত করছে।

যুদ্ধের দাবানল থামলেও এর পরবর্তী প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদী এবং বিপজ্জনক। যেসব উপসাগরীয় রাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে, তারা এখন তাদের সুরক্ষার জন্য নতুন পথ খুঁজছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়তো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে হাই-টেক ঢাল দিয়ে ঘিরে ফেলবে, কিন্তু ওমানের মতো দেশগুলো তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেল খোলা রাখছে। সবচেয়ে ভীতিকর সম্ভাবনাটি এখনো বাকি—‘সন্ত্রাসবাদ’। ১৯৭০ সালে জর্ডানে পিএলওর পরাজয়ের পর যেভাবে গোপন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল, ইরানের ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ইরান তাদের প্রক্সি ও গোপন নেটওয়ার্কগুলো ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে এমন এক চোরাগোপ্তা যুদ্ধের সূচনা করতে পারে, যা গত ৪৭ বছরেও বিশ্ব দেখেনি।

১৯৫৩ সালের ইরানের ব্যর্থ অভ্যুত্থান বা আজকের এই ধ্বংসলীলা—সবই যেন একটি চক্র। কেরমিট রুজভেল্টের সেই উক্তিটি আজও ধ্রুব সত্য— ‘বাইরের শক্তি দিয়ে কোনো দেশের ভাগ্য বদলে দেয়া যায় না।‘ ইরান যে বদলাবে, তা নিশ্চিত; তবে সেই পরিবর্তন কেবল ইরানি জনগণের হাত ধরেই আসতে হবে। বাইরে থেকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে যে নতুন ইরান গড়ার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তা কেবল ধ্বংস আর অনিশ্চয়তাই বয়ে আনবে। এই যুদ্ধের শেষ হয় না, এটি কেবল দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের অ্যাসোসিয়েট এডিটর ও ফরেন অ্যাফেয়ার্স কলামিস্ট ডেভিড ইগনেশিয়াসের নিবন্ধ থেকে অনূদিত ও সংক্ষেপিত

আরও