পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এমন ১০৫টি আসনে জিতেছে যেখানে স্পেশাল ইনটেনটিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দলটির জয় ব্যবধানের চেয়েও বেশি ছিল। আর এসব আসনের ৮৬টিতেই আগে কখনো বিজেপি জেতেনি। এমন তথ্য উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ডট ইনের এক বিশ্লেষণে।
পশ্চিমবঙ্গে মোট বিধানসভা আসন ২৯৪টি। এবারের নির্বাচনে বিজেপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে মমতা ব্যানার্জির টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটল।
গত সোমবার ঘোষিত ফলাফলে বিজেপি মোট ২০৭টি আসন পায়, যার অর্ধেকের কিছু বেশি ১০৫ আসন।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ। ছয় মাস ধরে চলা এ কার্যক্রম শেষে প্রায় ৯১ লাখ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে, ফলে বাংলাভাষী ভারতীয় এ রাজ্যের ভোটার তালিকা ১২ শতাংশ সংকুচিত হয়ে যায়। এ ভোটারদের মধ্যে অন্তত ২৭ লাখের বিষয় এখনো বিচারাধীন; বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিই ছিল একমাত্র বড় রাজনৈতিক দল, যারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এসআইআর সমর্থন করেছে।
নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে আগের নির্বাচনে ২১৫টি আসন পাওয়া তৃণমূল কংগ্রেস এবার নেমে আসে মাত্র ৮০ আসনে। তবে স্ক্রলের বিশ্লেষণ বলছে, তৃণমূলের পরাজয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনও ‘সম্ভবত’ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এমন ১০৫টি আসনে বিজেপি জয় পেয়েছে, যেখানে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া নামের সংখ্যা তাদের জয় ব্যবধানের চেয়েও বেশি। এ বিশ্লেষণ করা হয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে। আর এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারের তথ্য সংকলন করেছে কলকাতাভিত্তিক জননীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সবার ইনস্টিটিউট।
এ সম্পর্কিত একটি উদাহরণ বাঁকুড়া জেলার ইন্দাস আসন। ২০২১ সালেও এখানে বিজেপি জিতেছিল। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এ আসনে তৃণমূল বিজেপির চেয়ে ৯ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। এরপর ভোটার তালিকা সংশোধনের পর আসনটি থেকে মোট ৭ হাজার ৫১৫ জনের নাম বাদ পড়ে। সোমবার বিজেপি এখানে জেতে মাত্র ৯০০ ভোটের ব্যবধানে।
উল্লেখিত ১০৫ আসনের বড় অংশই আগে কখনো বিজেপির দখলে ছিল না। তৃণমূল তাদের হাতে থাকা ১২৯টি আসন বিজেপির কাছে হারায়। অন্যদিকে বিজেপি পাঁচ বছর আগে জেতা প্রতিটি আসনই ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জিও নিজের ভবানীপুর আসনে বিজেপির শীর্ষ নেতা সুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে হেরে যান। ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের দখলে থাকা এই আসনে এসআইআর-এ ৫১ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়েছিল
মমতা ব্যানার্জি। ছবি: সংগৃহীত
এ বিশ্লেষণের জন্য তৃণমূল থেকে বিজেপির হাতে যাওয়া আসনগুলোকে ‘সুইং সিট’ বা ভাসমান হিসেবে ধরা হয়েছে। স্ক্রলের বিশ্লেষণ অনুসারে, এমন ৮৬টি সুইং সিটে বিজেপির জয় ব্যবধান ছিল এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম।
উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর বিধানসভা আসনের কথা বলা হয়েছে। অনেক দশক ধরে আসনটি ছিল বামপন্থীদের ঘাঁটি। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৯৮৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এখানকার বিধায়ক ছিলেন। পরে মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হলেও আসনটি তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআই (এম)-এর মধ্যে পালাবদল হতে থাকে।
২০২১ সালে এখানে তৃণমূল জিতেছিল এবং সিপিআই (এম) দ্বিতীয় হয়েছিল। বিজেপি প্রার্থী ৫৩ হাজার ১৩৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল। গত মাসে মাঠপর্যায়ে গিয়ে স্ক্রল দেখতে পায়, এবারও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৃণমূল ও সিপিআই(এম)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু এসআইআর-এ যাদবপুর আসনে ৫৬ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়ে। সোমবার বিজেপি প্রথমবারের মতো আসনটি জেতে ২৭ হাজার ৭১৬ ভোটের ব্যবধানে, যা বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার অর্ধেকেরও কম। এখানে হঠাৎ বিজেপির ভোট বেড়ে ১ লাখ ৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। বিপরীতে, তৃণমূলের বর্তমান বিধায়ক আগেরবারের তুলনায় প্রায় ২০ হাজার কম ভোট পান। সিপিআই(এম) পায় ৪১ হাজারের কিছু বেশি ভোট।
এবারের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের অনেক শক্ত ঘাঁটিও ভেঙে পড়েছে। দলের পরিচিত অনেক নেতাই এমন আসনে হেরে যান, যেগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ধরা হতো।
বিদায়ী সরকারের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবার টালিগঞ্জ আসনে পরাজিত হন। বিজেপি প্রার্থী জেতেন ৬ হাজার ১৩ ভোটের ব্যবধানে। অথচ এসআইআর-এ এই আসনে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল ৩৭ হাজার ৮৮৯ নাম।
এছাড়া অন্তত ১০ জন মন্ত্রী একই পরিণতির মুখে পড়েন। যাদের মধ্যে আছেন শশী পাঁজা, সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, মলয় ঘটক ও স্নেহাশিস চক্রবর্তী। তাদের প্রত্যেকের আসনেই এসআইআর–এ বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল তাদের পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি।
সবশেষে, তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জিও নিজের ভবানীপুর আসনে বিজেপির শীর্ষ নেতা সুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে হেরে যান। ২০১১ সাল থেকে তৃণমূলের দখলে থাকা এই আসনে এসআইআর-এ ৫১ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়েছিল।