২০২২ থেকে ২০২৪

শান্তিপূর্ণ অন্তর্বর্তী কাল ও বদলে যাওয়া শ্রীলংকা

২০২২ সালের ১৩ জুলাই ভোর। প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে রাতের আঁধারে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন শ্রীলংকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে।

২০২২ সালের ১৩ জুলাই ভোর। প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে রাতের আঁধারে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন শ্রীলংকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। ক্ষমতায় আসেন তার এক সময়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রণিল বিক্রমাসিংহে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী শ্রীলংকা দেখে আরো বিস্মিত হয়েছিল বিশ্ব। জনগণের তীব্র ক্ষোভ, জ্বালানির অভাব, খাদ্য সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের সহিংসতা দেখা যায়নি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সরকারবিরোধী বড় কোনো আন্দোলন হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এ শান্তিপূর্ণ অবস্থা ছিল এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। বিশ্বের ইতিহাস যেখানে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সহিংসতা-দাঙ্গা, সামরিক হস্তক্ষেপ বা নতুন স্বৈরশাসনের দিকে মোড় নেয়, সেখানে শ্রীলংকায় দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।

আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কারনেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তাদের বিশ্লেষণে লেখে—শ্রীলংকার এই সহিংসতামুক্ত, সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক রূপান্তর দেশটির ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা অর্জনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। এ শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থাও অর্জন করেছে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণের পথকে আরো সহজ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী এ শান্তি কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই নয়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারেরও চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিল। বৈদেশিক বিনিয়োগের দরজা খুলে গেল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের সময়কাল ছিল বিপ্লব-পরবর্তী এক অনন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতার পর্ব। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উদাহরণের তুলনায় এ অভিজ্ঞতা একটি ব্যতিক্রমী পাঠের দাবিদার। শ্রীলংকা প্রমাণ করেছে, গণ-আন্দোলন কেবল ক্ষমতার পতন ঘটাতে পারে না, যদি তা শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়, তবে রাষ্ট্রকে নতুন ভিত্তিতে পুনর্গঠনের দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

২০১৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসের পতনের মধ্য দিয়ে শ্রীলংকা একটি গণতান্ত্রিক আশার সূচনা করেছিল। কিন্তু এ আশাকে মুছে ফেলেছিল রাজাপাকসে পরিবারের ২০১৯ সালে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, জাতীয়তাবাদী প্রচারণা ও বেপরোয়া ঋণনির্ভর অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে শ্রীলংকাকে দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করেন গোতাবায়া। ২০২১-২২ সালে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৭০ শতাংশের ওপরে; খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি থেকেই জন্ম নেয় বিক্ষোভের। তুমুল গণ-আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে রাজাপাকসে সরকারের। রনিল বিক্রমাসিংহের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।

‘অরাগালায়া’ আন্দোলনের মাধ্যমে গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের পর শ্রীলংকা এক অভূতপূর্ব শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। রণিল বিক্রমাসিংহের সরকার দুই বছর দুই মাস ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু তার সরকারও জনগণের অসন্তোষ দূর করতে ব্যর্থ হয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসেন বামপন্থী দল জনতা বিমুক্তি পেরামুনার (জেভিপি) নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েক, যিনি একেডি নামেও বহুল পরিচিত। জেভিপি একসময় সশস্ত্র বিপ্লবী দল ছিল, তবে নব্বইয়ের দশক থেকে তারা সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে থাকে। ‘ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার’ নামে একটি বাম গণতান্ত্রিক জোট গড়ে তোলে। অনূঢ়া কুমারা তার দলের অতীতের সহিংস রাজনীতির জন্য জনসমক্ষে ক্ষমা চান। সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলিমদের আস্থা অর্জনের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেন, যা ছিল শ্রীলংকার রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি র‍্যাংকড চয়েস ভোটিং পদ্ধতিতে বিজয়ী হন। তার বিজয় ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা—প্রথমবারের মতো তৃতীয় শক্তির প্রার্থী রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন। একই বছর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় সংসদীয় নির্বাচন। সেখানে অনূঢ়ার নেতৃত্বাধীন এনপিপি জোট ২২৫ আসনের মধ্যে ১৫৯টিতে জয়লাভ করে। নির্বাচনী পরিবেশ ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সংঘর্ষহীন এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত।

ক্ষমতায় এসেই অনূঢ়া কুমারা তার প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। তাতে তিনি দারুণ সফলও হন। চলতি বছরের এপ্রিলে শ্রীলংকার জাতীয় ভোক্তা মূল্যসূচক অনুযায়ী বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল মাইনাস শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে শ্রীলংকার অর্থনীতি ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পূর্বাভাসকৃত ৪ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৫ সালের মে মাসে নীতিগত সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ করেছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উৎসাহিত করতে সহায়ক। মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন ও কঠোর মুদ্রানীতি। ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস করে শুধু দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগণের জন্য টার্গেটেড ক্যাশ ট্রান্সফার চালু করা হয়। পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘সেন্ট্রাল অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট’ গঠন করে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে অপচয় কমানো হয়।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার দিকে মনোযোগ দেন অনূঢ়া কুমারা সরকার। যার অংশ হিসেবে ক্ষমতায় এসেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে পুনঃআলোচনা এবং ঋণ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। পূর্ববর্তী সরকারের অনিয়ন্ত্রিত বন্ড ঋণ এবং অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রকল্পের দায়ভার হালনাগাদ করা হয়।

রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় দেশীয় শিল্প ও কৃষি খাতের ওপর গুরুত্বারোপ করে বামপন্থী সরকার। চা, রাবার ও প্রযুক্তি সেবার রফতানিতে বিশেষ উৎসাহ দেয়া হয়। ‘মেড ইন শ্রীলংকা’ ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি করা হয় মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে।

অনূঢ়া ম্যাজিক দেখা গেছে পররাষ্ট্রনীতিতেও। তার বিজয়কে অনেকেই চীনের জন্য জয় ও ভারতের জন্য পরাজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই দেখা গেল ভিন্ন বাস্তবতা। অনূঢ়া সাফ জানিয়ে দেন, তার দল অতীতে চীনা মাওবাদে প্রভাবিত হলেও বর্তমানে বহুমুখী মৈত্রীনীতিতে বিশ্বাসী। ক্ষমতায় আসার পর ভারত সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জানান, তার সরকার ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিপরীত কোনো কার্যক্রম নেবে না। ভারত ও চীনের উভয়ের সঙ্গেই বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি হলেও অনূঢ়ার লক্ষ্য ছিল প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ নিশ্চিত করা। হাম্বানটোটা বন্দরের চুক্তি পুনর্বিবেচনা ও নতুন ইকোনমিক জোন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

খ্যাতিমান রাজনীতি বিশ্লেষক ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক নীল দেবোত্তার মতে, ‘অনূঢ়া কুমারার সরকার চীন ও ভারত উভয় থেকেই বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চেয়েছে। তবে তাদের গুরুত্ব ছিল এ বিনিয়োগ প্রকৃতপক্ষে শ্রীলংকার অর্থনীতির জন্য কতটা উপকারী হবে। রাজাপাকসে আমলের মতো “‍সাদা হাতি” প্রকল্প এড়ানোর ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন তিনি।’

এছাড়া জনপ্রশাসনের দুর্নীতি কমাতে জাতীয় সেবা কার্যক্রম ডিজিটাল করা হয়। ভূমি নিবন্ধন, ব্যবসায়িক লাইসেন্স এবং কর পরিশোধ ব্যবস্থা একীভূত করা হয় একক অনলাইন প্লাটফর্মে। এনআইডি ও ট্যাক্স আইডি একত্র করে ‘ইউনিফায়েড সিটিজেন প্রোফাইল’ চালু করা হয়। যার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পেতে হয়রানি কমে আসে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে স্বচ্ছতা স্কোর চালু করে কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়।

সংসদ নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক—প্রায় দ্বিগুণ নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে প্রভাবশালী প্রতিনিধিত্ব পাওয়া যায় পার্লামেন্টে, যা পূর্ববর্তী সরকারগুলোতে বিরল ছিল। সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলিমদের জন্য পৃথক উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ করেন অনূঢ়া কুমারা। তামিলপ্রধান জেলাগুলোতে ভাষা, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়। তরুণদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা, স্টার্টআপ ফান্ড এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ চালু করা হয়। শিক্ষাকে উৎপাদনমুখী করতে কারিগরি প্রশিক্ষণ, সফটওয়্যার স্কিল ও ভাষা শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ায় সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার জন্য একাধিক সংস্কার চালু করা হয়।

অনূঢ়ার সরকারকে এখনো চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে—বৈদেশিক ঋণের বোঝা, বৈশ্বিক বাজারে শ্রীলংকার পণ্যের প্রতিযোগিতা, চীনা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ ও অভ্যন্তরীণভাবে চরমপন্থী বৌদ্ধ গোষ্ঠীর অস্থিরতা এখনো বিদ্যমান। তবুও বলা যায়, মাত্র এক বছরের মাথায় অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের নেতৃত্বে শ্রীলংকা যে স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে, তা দেশটির ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে শ্রীলংকার বিপ্লব ছিল একটি কাঠামোগত বিপ্লব। বিপ্লবোত্তর অর্থনীতি পুনর্গঠনে অনূঢ়া কুমারার নেতৃত্বে শ্রীলংকা নতুন সম্ভাবনার দিকে যাত্রা শুরু করেছে। রাজনীতি, প্রশাসন ও কূটনীতিতে তিনি যে ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত।

নীল দেবোত্তার মতে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত সময় ছিল শ্রীলংকার জন্য এক ঐতিহাসিক শান্তিপূর্ণ রূপান্তর। যে রূপান্তর রাজাপাকসে পরিবারের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে, অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করেছে, যা গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের দৃষ্টান্ত।

আরও