কানাডায় চলমান কয়েকশ দাবানলের ধোঁয়া ও ছাইয়ে ঢেকে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশ। এর প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে ডেট্রয়েট, শিকাগো, ওয়াশিংটন ডিসি, নিউ ইয়র্কের মতো প্রধান শহরগুলো। এমন পরিস্থিতিতে দূর্যোগকবলিত প্রতিবেশী দেশের ওপর নতুন করে কর আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার অভিযোগ, কানাডার ইচ্ছাকৃত অবহেলার কারণেই এমন বিপর্যয় ঘটেছে। খবর বিবিসি।
কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত দেশটিতে ৮৮৮টি দাবানল সক্রিয় ছিল। এর অধিকাংশই এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর মধ্যে কেবল ওন্টারিও প্রদেশেই জ্বলছে ১৯০টির বেশি দাবানল।
দাবানল ও ধোঁয়ার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে এরই মধ্যে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ না করে আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তার হাত বাড়াতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড। এরপরই ট্রাম্পের পক্ষ থেকে নতুন করে কর আরোপের হুমকি এলো।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, কানাডার ইচ্ছাকৃত অবহেলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র অনর্থক নোংরা, দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বাতাসে আক্রান্ত হচ্ছে। বনের ঝোপঝাড় ও গাছপালা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করার জন্য সরকারকে দায়ী করে ট্রাম্প জানান, তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে ফোন করে এর কৈফিয়ত চাইবেন।
এদিকে এ সংকটকে কেন্দ্র করে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিতর্কিত দাবিটি আবারো তুলেছেন মার্কিন রাজনীতিকদের একাংশ। আর রিপাবলিকানদের এমন অবস্থানে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন কানাডার নাগরিকরা। প্রতিবাদস্বরূপ অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বর্জন করছেন। এছাড়া কানাডার অর্থায়নে ওন্টারিও ও মিশিগানের মধ্যে নির্মিত ‘গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতু’র উদ্বোধন পিছিয়ে দেয়ার দাবিও উঠছে অনলাইনে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর কানাডার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী জানান, দুর্যোগ মোকাবেলায় দুই দেশের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮২ সালের দ্বিপক্ষীয় অগ্নিনির্বাপণ চুক্তি এবং ২০২৫ সালের জি৭ শীর্ষ সম্মেলন থেকে গৃহীত সহায়তা চুক্তির আওতায় দুই দেশ এখনো সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।
কানাডার পার্লামেন্ট সদস্য এলিয়েনর ওলসজেউস্কি এক বিবৃতিতে বলেন, দাবানল প্রতিরোধ ও বনের টেকসই সুরক্ষায় কানাডা এরই মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি (১২ বিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগ করেছে। এটি এমন এক সংকট যার কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। আমরা সর্বোচ্চ গতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত বাণিজ্য নীতি নিয়ে গত এক বছর ধরেই ওয়াশিংটন ও ওটাভার মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। গত বছর কানাডার ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প, যার ফলে কয়েক দশকের মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা মুখ থুবড়ে পড়ে। নতুন কোনো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি এখনো আলোর মুখ না দেখায় এ দাবানল ইস্যু দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলতে পারে।
কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের ভয়াবহ দাবানলে দেশটির প্রায় ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) হেক্টর বনভূমি ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রেও। ওটাভার দাবানলের ঘন ধোঁয়ার আস্তরণ মিনেসোটা, মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া, ওহাইও এবং নিউইয়র্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর আকাশকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে।
ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে উত্তর ও মধ্য-যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ (হ্যাজার্ডাস) বাতাসের সতর্কতা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে অসংখ্য আউটডোর অনুষ্ঠান ও সমাবেশ বাতিল করা হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বৈশ্বিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আইকিউএয়ার’-এর পরিসংখ্যানের বরাতে জানা গেছে, গত শুক্রবার বায়ু দূষণের দিক থেকে মার্কিন শহর ডেট্রয়েট বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় প্রথম স্থানে উঠে আসে। দূষণের এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমের আরেক প্রধান শহর শিকাগো। এছাড়া তালিকায় ওয়াশিংটন ডিসির অবস্থান ছিল পঞ্চম এবং নিউইয়র্ক ছিল সপ্তম স্থানে।