ইরান বর্তমান যুদ্ধকে কেবল সামরিক লড়াই হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও নির্মম সহনশীলতার পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করছে। তেহরানের কৌশল এখন স্পষ্ট— ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের পথগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেয়া এবং বিশ্ববাজারকে এমনভাবে অস্থিতিশীল করে তোলা, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল রাজনৈতিক চাপে পড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হারানোর পরও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে। তাদের সামরিক নেটওয়ার্ক এবং ছায়া বাহিনীগুলো পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধ পরিচালনা করছে, যা প্রমাণ করে যে তারা এই লড়াইকে একটি অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত যুদ্ধ হিসেবে দেখছে।
ক্ষমতা কাঠামোয় পরিবর্তন ও আইআরজিসির একক আধিপত্য
যুদ্ধের শুরুর দিকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইআরজিসি মূল ভূমিকা পালন করেছে। এর মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে এই সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল।
লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিকসের বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গেসসহ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান এখন আহত প্রাণীর মতো—যা ক্ষতবিক্ষত হলেও আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। তারা মনে করে, তাদের টিকে থাকা হুমকির মুখে, তাই তারা এই মন্দার আঘাত সবাইকে নিয়ে সহ্য করার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নেমেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা
ইরানের এই ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ কৌশল তাদের প্রতিবেশীদের জন্য অর্থনৈতিক সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। কাতার থেকে শুরু করে সৌদি আরব পর্যন্ত বিভিন্ন জ্বালানি কেন্দ্রগুলোয় হামলা চালিয়ে ইরান বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তাদের হামলায় ইরানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়েছে। তবে আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলছে, ইরানের কাছে এখনো যুদ্ধের আগে থাকা মজুতের বড় অংশ থাকতে পারে। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে আরো কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা থাকতে পারে তেহরানের। এই সময়টুকু ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াবে এবং রাজনৈতিক চাপও বাড়তে পারে।
ইরানের ভেতরেও যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষক বলছেন, দেশটি ধীরে ধীরে যুদ্ধকালীন অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। বন্দরগুলোয় পণ্য দ্রুত খালাস করা হচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক বিভাজনের লক্ষণ দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় সংহতির অনুভূতি বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ: কে আগে পিছু হটবে?
এই যুদ্ধের মূল প্রশ্ন এখন দাঁড়িয়েছে—কে আগে নতি স্বীকার করবে? ইরান আশা করছে, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ধস তাদের জন্য একটি পথ বের করে দেবে। অন্যদিকে, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো অচিরেই ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং পারমাণবিক অবকাঠামো নিষ্ক্রিয় করার দাবি তুলে বিজয়ের ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধের একটি সম্মানজনক সমাপ্তি চাইতে পারেন। তবে তেহরানের জন্য কেবল টিকে থাকাটাই হবে তাদের বড় সাফল্য। যুদ্ধ শেষে যে ইরান উঠে আসবে তা হয়তো আগের চেয়ে দুর্বল ও ক্ষতবিক্ষত থাকবে। কিন্তু এই ‘রক্তাক্ত ইরান’ বিশ্ব রাজনীতির জন্য আগে থেকে অনেক বেশি অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।