বিদ্বেষ বাড়ছে অনলাইনে, মালয়েশিয়ায় বন্ধ রোহিঙ্গা শিশুদের একাধিক স্কুল

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে অন্তত নয়টি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণও কঠোর হয়েছে। এতে প্রযুক্তি প্লাটফর্মগুলো তাদের কনটেন্ট কতটা মডরেশন করছে তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে

১২ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শরণার্থী নূর। মালয়েশিয়ায় বসবাসরত এ শিশু গত মাসে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ স্কুলে যাওয়ার পথে দুই ব্যক্তি তাকে মারধরের হুমকি দিয়েছেন।

নূরের ভাষ্য— ওই ব্যক্তিরা তাকে বলেছিল, ‘তুমি স্কুলে যেতে চাও কেন? আমাদের দেশ দখল করতে চাও?’ নিরাপত্তার কারণে প্রতিশোধের আশঙ্কায় পরিবার নূরের পুরো নাম প্রকাশ করতে চায়নি।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ঘটনাটি ওঠে এসেছে। সেখানে অধিকারকর্মী ও শিক্ষকদের বরাতে বলা হচ্ছে, নূরের মতো আরো অনেক রোহিঙ্গা শিশু হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে মালয়েশিয়াজুড়ে শরণার্থীদের পরিচালিত বেশ কয়েকটি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গা কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট শরিফা শাকিরা বলেন, ‘শিশুরা এতটাই ভীত যে তারা ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছে। আপনি শুধু এক-দুদিনের জন্য একটি শিশুকে হয়রানি করছেন না, বরং তার মনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত তৈরি করছেন।’

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে অন্তত নয়টি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণও কঠোর হয়েছে। এতে প্রযুক্তি প্লাটফর্মগুলো তাদের কনটেন্ট কতটা মডরেশন করছে তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

স্কুল বন্ধ বা অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা সম্পর্কে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

মালয়েশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না; তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছেন।

বন্ধ করে দেয়া একটি রোহিঙ্গা স্কুল। ছবি: রয়টার্স

কভিডের পর বদলে যায় জনমত

মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। তবে কভিড-১৯ মহামারীর সময় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভাইরাস ছড়ানো, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন এবং চাকরির প্রতিযোগিতা বাড়ানোর অভিযোগ ওঠার পর জনমত নেতিবাচক হতে শুরু করে।

গত সপ্তাহে পার্লামেন্টে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী লুকানিসমান আওয়াং সাউনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ঘিরে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা সামাল দিতে গিয়ে মালয়েশিয়ার জনগণ নিজেদের ওপর বাড়তি চাপ অনুভব করতে শুরু করেছে।’

নতুন করে বিদ্বেষের ঢেউ

গত মে মাসে রোহিঙ্গাদের একটি গোষ্ঠীর কোরবানি ঘিরে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এতে মেটার মালিকাধীন বিভিন্ন প্লাটফর্ম ও বাইটড্যান্সের টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ‘সরিয়ে দেয়ার’ দাবিতে একটি অনলাইন পিটিশন গত মাসে অধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তির পর সরিয়ে নেয়া হয়। তবে সেটি অপসারণের আগে প্রায় পাঁচ লাখ স্বাক্ষর পেয়েছিল।

শরিফা শাকিরা বলেন, ‘এখন যা দেখা যাচ্ছে, তা কভিডের সময়ের তুলনায় ১০০ গুণ বেশি ভয়াবহ।’

রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু পোস্টে রোহিঙ্গা শরণার্থী, এমনকি শিশুদের বিরুদ্ধেও সহিংসতার উসকানি দেয়া হয়েছে। মেটার মালিকানাধীন থ্রেডসে একটি আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘লেমপাং রোহিঙ্গা’, যার অর্থ মালয় ভাষায় ‘রোহিঙ্গাকে চড় মারো’।

রোহিঙ্গা বসতির ভিডিও ধারণ করে কর্তৃপক্ষকে তাদের অবস্থান জানাতেও উৎসাহিত করেছেন কিছু ইনফ্লুয়েন্সার।

তবে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন ইসমাইল গত মাসে বলেন, সরকার ইচ্ছামতো শরণার্থীদের বহিষ্কার করতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সরকার ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি জানান। যদিও এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন আর্টিকেল ১৯ বলেছে, অনলাইন বিদ্বেষমূলক প্রচারণার কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নজরদারি বেড়েছে। ফলে তদন্ত, অভিযান এবং স্কুল বন্ধের ঘটনা ঘটছে।

সংগঠনটির এক মুখপাত্র বলেন, আক্রমণ মোকাবেলায় মানবাধিকারভিত্তিক কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি। বরং সরকারের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা উত্তেজনা ও হয়রানি কমানোর পরিবর্তে আরো ক্ষতির কারণ হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থীদের লক্ষ্য করে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ভুয়া তথ্য ও অমানবিক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় ‘উদ্বিগ্ন’ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং শরণার্থী ও স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করছে বলে জানায়।

ছবি: রয়টার্স

স্কুলও হচ্ছে লক্ষ্যবস্তু

অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এমন অভিযোগে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের পরিচালিত কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে।

মালয়েশিয়ায় শরণার্থীরা আইনগতভাবে কাজ করতে পারেন না। তাদের সন্তানদেরও সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে তারা বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত স্কুল বা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল।

নূরের ঘটনার পর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তার শিক্ষক ও স্কুলের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধ করে দেয়। কাছাকাছি আরো দুটি শরণার্থী স্কুলও বন্ধ হয়ে যায়।

২০২২ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন এক রোহিঙ্গা শিক্ষক, যিনি নিজেও একজন শরণার্থী। তিনি বলেন, শিশুদের ভবিষ্যতে তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন অথবা নিরাপদে নিজ দেশে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক শিক্ষা দেয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অনেকে মালয়েশিয়ার আইন ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন। কিন্তু আমার কাছে এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করার অর্থ হলো অন্যদের আইন বুঝতে ও মেনে চলতে শেখানো।’

উত্তরাঞ্চলীয় কেদাহ রাজ্যের একটি স্কুলও প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকায় চলতি মাসে বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই স্কুলের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল বলে এক শিক্ষক জানান।

শিক্ষক ও কমিউনিটি নেতাদের তথ্যানুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ওঠার পর নিরাপত্তাজনিত কারণ বা সরকারি পদক্ষেপের কারণে অন্তত নয়টি রোহিঙ্গা স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় তারা প্রকাশ্যে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি।

এখনো চালু রয়েছে এমন তিনটি স্কুলের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তারা শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম না পরতে বলা, বাহ্যিক কার্যক্রম বাতিল করাসহ বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন।

শরিফা শাকিরার আশঙ্কা, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকলে রোহিঙ্গা কিশোরীদের মধ্যে বাল্যবিবাহ এবং শিশুদের ভবঘুরে হয়ে পড়ার মতো সামাজিক সমস্যা আরো বাড়বে।

তিনি বলেন, ‘অনেকে অভিযোগ করেন, রোহিঙ্গা শিশুরা রাস্তায় ভিক্ষা করে। স্কুল বন্ধ থাকলে এমন শিশুর সংখ্যা আরো বাড়বে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

অধিকারকর্মীদের মতে, এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতামূলক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর—সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে।

আর্টিকেল ১৯ জানায়, তারা যে পোস্টগুলো মেটা ও টিকটককে জানিয়েছিল, তার কিছু সরানো হলেও অনেক কনটেন্ট এখনো অনলাইনে রয়েছে। রয়টার্সের পাঠানো ১০টি কনটেন্টের মধ্যে মেটা সাতটি এবং ১১টির মধ্যে টিকটক আটটি সরিয়ে দিয়েছে।

আর্টিকেল ১৯-এর মুখপাত্র বলেন, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যবিরোধী নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন একরকম নয়। বিশেষ করে সাংকেতিক ভাষা, ছবি এবং বিভিন্ন ভাষার সূক্ষ্ম ব্যবহার শনাক্ত করতে প্রায়ই ব্যর্থ হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থা।

মেটা ও টিকটক জানিয়েছে, তারা স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও মানব পর্যালোচনার সমন্বয়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যবিরোধী নীতিমালা কার্যকর করে। টিকটক ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর মন্তব্য পোস্ট করার আগে পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেয়ার মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ব্যবহার করে।

এদিকে স্কুলে যেতে না পেরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নূর বলে, ‘আমি যদি স্কুলে যেতে না পারি, তাহলে কিছুই শিখতে পারব না। আর আমি কিছুই হতে পারব না।’

আরও