দক্ষিণ মেরুর বরফ স্তরকে কাজে লাগিয়ে মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের নতুন পথ দেখিয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন। সে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন বেলজিয়ামে জন্ম নেয়া এ কণা পদার্থবিজ্ঞানী। সুইডেনের স্টকহোমে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তার নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।
নোবেল কমিটি বলছে, মহাবিশ্বের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পদ্ধতি উদ্ভাবন এবং আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি গড়ে তোলায় অবদানের জন্য হালজেনকে এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের অধ্যাপক। পুরস্কার হিসেবে তিনি পাবেন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রাউন।
নিউট্রিনো এমন এক ধরনের মৌলিক কণা, যা মহাবিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতি মুহূর্তে বিপুলসংখ্যক নিউট্রিনো পৃথিবী ও মানুষের শরীর ভেদ করে চলে যায়। কিন্তু এসব কণা পদার্থের সঙ্গে খুব কমই মিথস্ক্রিয়া করে বলে সাধারণভাবে তাদের শনাক্ত করা কঠিন। অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ালে তা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।
এ দুর্লভ ঘটনাকেই কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন হালজেন। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রথম দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্তের জন্য বরফ ব্যবহারের ধারণা উপস্থাপন করেন। তার পরিকল্পনা ছিল, কোনো নিউট্রিনো বরফের ভেতরে থাকা পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে যে আলোকঝলক তৈরি হবে, তা বরফের গভীরে স্থাপন করা আলোকসংবেদী সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত করা।
দক্ষিণ মেরুর বরফ এ কাজের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী বলে মনে করেন হালজেন। কারণ সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল বরফ রয়েছে। তার ধারণা ও নেতৃত্বের ওপর ভিত্তি করে পরে গড়ে ওঠে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফের মধ্যে অসংখ্য আলোকসংবেদী সেন্সর বসিয়ে তৈরি করা হয় এ বিশাল নিউট্রিনো শনাক্তকারী।আইসকিউবের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১১ সালে। এরপর গবেষকরা মহাবিশ্বের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এসব নিউট্রিনো বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের এমন কিছু শক্তিশালী পরিবেশ সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিচ্ছে, যেগুলো সম্পর্কে আগে খুব কম তথ্য ছিল।
উচ্চ শক্তির নিউট্রিনোর বিশেষত্ব হলো অন্য অনেক কণার মতো এগুলো মহাবিশ্বের পথে সহজে দিক পরিবর্তন করে না বা শক্তি হারায় না। ফলে যে উৎস থেকে নিউট্রিনো যাত্রা করে, সেখানকার তথ্য অনেকটা অক্ষুণ্ন অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে। এ কারণে মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও অত্যন্ত শক্তিশালী উৎস সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে নিউট্রিনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হয়ে উঠেছে।
নিউট্রিনোর এসব তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে চাইছেন, মহাবিশ্বের উচ্চ শক্তির নিউট্রিনোগুলোর উৎস কোথায়, সেগুলো কীভাবে তৈরি হয় এবং এসব উৎসের ভেতরে কী ধরনের শক্তিশালী প্রক্রিয়া কাজ করে। ভবিষ্যতে আইসকিউব থেকে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে আগে অজানা কোনো মহাজাগতিক ঘটনারও সন্ধান মিলতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা।