জাতিসংঘে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের পক্ষে জোরালো সাফাই দেয়ার চেষ্টা করলেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা মোকাবেলার চেষ্টা হিসেবে গতকাল তিনি এ বক্তব্য দেন। কিন্তু এসময় জাতিসংঘের অধিবেশন থেকে প্রতিনিধিদের বড় একটি অংশ বেরিয়ে যান। খবর রয়টার্স।
নেতানিয়াহু বক্তব্য শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভক্তির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিবাদে কয়েক ডজন প্রতিনিধি হল থেকে বেরিয়ে যান। তাদের ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ’ বলে আখ্যা দেন নেতানিয়াহু। অন্যদিকে গ্যালারিতে থাকা তার সমর্থকরা হিব্রু ভাষায় স্লোগান দেন, ‘ইসরায়েলের জনগণ বেঁচে আছে।’
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে আক্রমণ করেন। মামদানি তাকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলেছিলেন। পশ্চিম ইউরোপের নেতাদেরও আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। তিনি অভিযোগ করেন, তারা ‘ইহুদিবিদ্বেষী জনতার’ কাছে নতি স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি কাতার ও তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরায়েল সম্পর্কে মিথ্যা ছড়ানোর অভিযোগ তোলেন।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের পাঁচ সপ্তাহেরও কম সময় বাকি রয়েছে। এর মধ্যে নেতানিয়াহু প্রায় ৪০ মিনিটের বক্তব্য অনেকটাই নির্বাচনী প্রচারের ভাষণের মতো ছিল। ইসরায়েলের চারটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলই পিক আওয়ারে বক্তব্যটি সরাসরি সম্প্রচার করে।
বক্তব্যের আগে নেতানিয়াহু সরকারের পক্ষ থেকে ম্যানহাটনজুড়ে ইসরায়েলপন্থী ও ইরানবিরোধী ৫০০টি বিলবোর্ড এবং ইসরায়েলের সমর্থনে বার্তা বহনকারী কয়েক ডজন ট্রাকের জন্য অর্থ দেয়া হয়। এ তথ্য নেতানিয়াহুর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়।
মতামত জরিপে নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে পিছিয়ে থাকার চিত্র উঠে আসছে। এ অবস্থায় বক্তব্যে তিনি ইসরায়েলকে সাতটি ফ্রন্টে লড়াই করছে বলে তুলে ধরেন।
নিউইয়র্কের রাস্তায় বিক্ষোভ
জাতিসংঘের কাছে গতকাল কয়েকশ বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তাদের একটি সড়ক অবরোধ করে স্লোগান দেন, ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেয়া বন্ধ করুন, গাজাকে বাঁচতে দিন’ এবং ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেয়া বন্ধ করুন, ইরানকে বাঁচতে দিন।’ পুলিশ তাদের আটক করে।
জাতিসংঘে বক্তব্য দিতে যুক্তরাষ্ট্রে সংক্ষিপ্ত সফরে ছিলেন নেতানিয়াহু। তবে অস্বাভাবিকভাবে এ সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার কোনো নির্ধারিত বৈঠক নেই। বক্তব্যে অবশ্য ট্রাম্পের প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের রাষ্ট্রকে রক্ষা করে যাব। আমরা জয়ী হতে থাকব, কারণ আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। বর্বরদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো অংশীদার আমরা পাইনি। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। তার সাহসী নেতৃত্বের জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই।’
বাড়ছে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা
প্রায় তিন বছর আগে হামাসের নেতৃত্বে হামলার জবাবে গাজায় যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইসরায়েল ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছে।
২০২৪ সালে নেতানিয়াহু, তার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং হামাসের তৎকালীন সামরিক কমান্ডারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর পর থেকে তিনি অনেক দেশে ভ্রমণ করতে পারছেন না।
চলতি মাসের শুরুতে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। এ ঘটনায় ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটাই মৃদু।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘এসব দেশের নেতারা ইহুদিবিদ্বেষী জনতার কাছে নতি স্বীকার করার পথ বেছে নিয়েছেন। তারা দুর্বলতাকে বেছে নিয়েছেন। তারা তোষামোদকে বেছে নিয়েছেন।’
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিষয়টিও তিনি খাটো করে দেখেন। তিনি বলেন, সেখানে ‘মাত্র ১৫০ জনের মতো একদল তরুণ অপরাধী’ রয়েছে, যারা পাথর ছোড়ে এবং জলপাইগাছ কেটে ফেলে।
তিনি বলেন, ‘মাঝে মধ্যে... তারা আগুনও জ্বালিয়েছে। আমি এটা সহ্য করতে পারি না। আমি আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া সহ্য করব না। আমরা আইনের দেশ।’