তৃতীয় দেশে অভিবাসী বহিষ্কার ফের চালুর অনুমতি পেল ট্রাম্প প্রশাসন

অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গত বছর এই নীতি চালু করে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় সরকারের কাছ থেকে নাগরিকদের গ্রহণের সম্মতি না পাওয়ায় তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সমস্যায় পড়ে। সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসীদের অন্য কোনো দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়। ওই দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিবাসীর কোনো সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, তাতে নীতিটির প্রয়োগে বাধা রাখা হয়নি

নিজ দেশের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই—এমন তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিতর্কিত কার্যক্রম সাময়িকভাবে ফের শুরুর অনুমতি দিয়েছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। একইসঙ্গে এ-সংক্রান্ত মামলায় চলতি বছরের ডিসেম্বরেই মূল যুক্তিতর্ক শুনবে আদালত। তবে এর আগে সংশ্লিষ্ট অভিবাসীদের মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানানোর সুযোগ দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। খবর সিএনএন।

সিদ্ধান্তটি গতকাল দেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো ট্রাম্প প্রশাসনকে সাময়িকভাবে কার্যক্রমটি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিল সর্বোচ্চ আদালত। আদালতের তিন উদারপন্থী বিচারপতি এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন।

আপাতত বহিষ্কার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারলেও মামলাটির মূল বিষয় নিয়ে ডিসেম্বর মাসে শুনানি করবে সুপ্রিম কোর্ট। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিসংক্রান্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা আদালতের চলতি মামলার তালিকায় যুক্ত হলো। আগামী জুলাইয়ের মধ্যে এ মামলার রায় আসতে পারে।

অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গত বছর এই নীতি চালু করে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় সরকারের কাছ থেকে নাগরিকদের গ্রহণের সম্মতি না পাওয়ায় তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সমস্যায় পড়ে। সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসীদের অন্য কোনো দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়। ওই দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিবাসীর কোনো সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, তাতে নীতিটির প্রয়োগে বাধা রাখা হয়নি।

এ নীতির আওতায় এরই মধ্যে আনুমানিক ২৫ হাজার অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

গত বছর অভিবাসী অধিকারকর্মীদের প্রকাশ করা তথ্যের পর বিষয়টি ব্যাপক নজরে আসে। তখন একদল অভিবাসীকে প্রথমে দক্ষিণ সুদানে পাঠানোর কথা থাকলেও তাদের জিবুতিতে আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের একটি রূপান্তরিত কনেক্স শিপিং কনটেইনারে আটক রাখা হয়।

মামলাটির মূল বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে সুপ্রিম কোর্ট তিনটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন নির্ধারণ করেছে— ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রায় দেয়া জেলা আদালতের এ মামলা নিষ্পত্তির এখতিয়ার, ওই আদালতের সিদ্ধান্ত মামলায় প্রভাবিত পুরো শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করার ক্ষমতা ছিল কিনা এবং তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসীদের পাঠানোর ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি আইনসম্মত কিনা। একইসঙ্গে প্রশাসন চাইলে আরো কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে।

সংক্ষিপ্ত ও বিচারপতিদের নামবিহীন আদেশে নিজেদের সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র লরেন বিস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘১৮ মাসের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো সুপ্রিম কোর্টকে একই জেলা বিচারকের সেই প্রচেষ্টা ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। এর মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসীদের রাজি তৃতীয় দেশগুলোয় ট্রাম্প প্রশাসনের পাঠানো বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে জড়িত অনেকেও রয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আজকের সুপ্রিম কোর্টের রায় আবারো প্রেসিডেন্টের স্বদেশ নিরাপত্তা কর্মসূচির আইনসম্মত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।’

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। এর মাধ্যমে বস্টনভিত্তিক প্রথম সার্কিট ইউএস কোর্ট অব আপিলসের এমন একটি সিদ্ধান্ত স্থগিত করার আবেদন জানানো হয়, যা কার্যত তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসীদের পাঠানোর কার্যক্রম আটকে দিয়েছিল। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, বিষয়টি জরুরি। কারণ আপিল আদালতের সিদ্ধান্তের কারণে চলমান অভিবাসী অপসারণ কার্যক্রমে ‘বড় ধরনের লজিস্টিক সমস্যা’ তৈরি হয়েছে।

গত বছর মামলাটির আগের একটি পর্যায়েও এই নীতি পর্যালোচনা করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। তখন তিন উদারপন্থী বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র, এলেনা কাগান ও কেটানজি ব্রাউন জ্যাকসনের বিরোধিতা সত্ত্বেও নীতিটি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। পরে জিবুতিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি নির্দিষ্ট দলের অভিবাসীদের সামরিক ঘাঁটিতে আটকে রাখার ঘটনা নিয়ে করা মামলায়ও আদালত আবার প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়।

মার্কিন বিচার বিভাগের আবেদনে অভিযোগ করা হয়, সুপ্রিম কোর্ট বারবার নীতিটি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়ার পরও নিম্ন আদালতগুলো এর বিরুদ্ধে রায় দিয়ে ‘তিন গুণ বেশি’ একই অবস্থান নিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, সর্বশেষ আদালতের সিদ্ধান্তের কারণে ‘বিশৃঙ্খলা’ তৈরি হয়েছে এবং কয়েক ডজন অভিবাসীকে বহনকারী ফ্লাইট বাতিলের নির্দেশ পাওয়ার পর নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হয়েছে।

তবে অভিবাসীদের পক্ষে থাকা সংগঠনগুলো সুপ্রিম কোর্টকে বলেছে, নিম্ন আদালত এবার মামলায় চূড়ান্ত রায় দিয়েছে। এর সঙ্গে আগে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছা সেই প্রাথমিক সিদ্ধান্তগুলোর পার্থক্য রয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের জরুরি ভিত্তিতে দেয়া সিদ্ধান্তগুলো মামলার মূল বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত রায় নয়, যদিও সেগুলো আদালত কোন দিকে এগোতে পারে, সে বিষয়ে একটি ইঙ্গিত দিতে পারে।

মামলার কেন্দ্রীয় আইনি প্রশ্নটি ১৯৯৪ সালে মার্কিন সিনেটে অনুমোদিত নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তি কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চারকে ঘিরে। এই চুক্তির অধীনে সাধারণভাবে এমন কোনো দেশে কাউকে বহিষ্কার বা প্রত্যর্পণ করা নিষিদ্ধ, যেখানে ওই ব্যক্তি নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।

তবে কোনো দেশে কাউকে পাঠালে তিনি নির্যাতনের শিকার হতে পারেন কিনা, তা কীভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট অভিবাসীর কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার থাকবে—এ বিষয়ে আইনটি স্পষ্ট নয়।

নিম্ন আদালতগুলো বলেছে, এই আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট অভিবাসীকে নোটিশ দিতে হবে এবং তিনি যে দেশে পাঠানো হতে পারেন সেখানে নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে—এমন বিশ্বাসযোগ্য দাবি তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে। তবে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে এমন সামগ্রিক নিশ্চয়তা পাওয়া যথেষ্ট যে সেখানে পাঠানো কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতন করা হবে না।

অভিবাসীদের পক্ষে থাকা আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টকে বলেন, ‘স্থগিতাদেশ না দেয়ার অর্থ তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসীদের পাঠানো বন্ধ করা নয়। বরং এর অর্থ হলো, তাদের তা আইনসম্মতভাবে করতে হবে।’

আরও