এর আওতায় ইউরোপ ও এশিয়ার বেশকিছু ক্রেতা দেশের এলএনজি সরবরাহ বাতিল অব্যাহত থাকবে। এশিয়ার ক্রেতাদের মধ্যে ফোর্স মেজরের আওতায় রয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ।
‘ফোর্স মেজর’ হচ্ছে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীর মতো অপ্রত্যাশিত ও অনিবার্য পরিস্থিতিতে চুক্তি পালনের বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়িক অব্যাহতি।
দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী কাতার। প্রতি বছর দেশটি থেকে অন্তত ৪০ কার্গো এলএনজি আসে দেশে। সংঘাত না বাধলে দীর্ঘমেয়াদি দুটি চুক্তির আওতায় চলতি অর্থবছরে দেশটি থেকে মোট ৫৬ কার্গো এলএনজি আসার কথা ছিল। যদিও এখন এসব কার্গোর মধ্যে অর্ধেক পাওয়ার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
ব্লুমবার্গের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দোহা নিউজ জানিয়েছে, বাংলাদেশের জন্য এলএনজি সরবরাহে ফোর্স মেজরের মেয়াদ সেপ্টেম্বরের পরও বাড়ানো হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো কাতার এনার্জি থেকে বার্তা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
ফোর্স মেজর নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি কাতার এনার্জি পেট্রোবাংলাকে জানিয়েছে কিনা জানতে চাইলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখনো এ বিষয়ে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। তবে অন্যান্য ফোর্স মেজরের বিষয়টি আমরা শুনেছি।’
এদিকে এশিয়ায় কাতার এনার্জির আরেক ক্রেতা পাকিস্তানকে গত সপ্তাহে জানানো হয়েছে, এলএনজি কার্গো বাতিলের এ পরিস্থিতি অক্টোবর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। বিষয়টি তাদের নোটিস দিয়ে জানানো হয়েছে। আর ইউরোপের আরো কয়েকজন ক্রেতাও একই ধরনের নোটিস পেতে শুরু করেছে বলে দোহা নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এলএনজির অন্যতম বড় সরবরাহকারী কাতার এনার্জির ফোর্স মেজরের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা বিকল্প উপায়ে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে বড় সংকট তৈরি হওয়ায় সরকার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্তও নেয়। যদিও এ পদ্ধতিতে কিনতে গিয়ে অন্তত ছয়টি কার্গো দিতে ব্যর্থ হয় সরবরাহকারীরা। এতে দেশে বড় ঘাটতি তৈরি হয়, যা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা, আবাসিক ও সিএনজি খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
এদিকে দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে কার্গো পেতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বাড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থের বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বাড়িয়েছে সরকার। গত সপ্তাহে পেট্রোবাংলা দুই কার্গো এলএনজি কিনেছে, যার প্রতি এমএমবিটিইউর দাম পড়েছে ২৪ ডলারের ওপরে।
এলএনজি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন ও প্রতিযোগিতা বাড়াতে পেট্রোবাংলা সরবরাহকারীর তালিকা আরো বড় করছে। বর্তমানে ২৯টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। নতুন করে আরো নয়টি কোম্পানিকে যোগ্য বিবেচনা করে তালিকাভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে চিঠি পাঠিয়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত এলএনজি কিনতে দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কোম্পানির তালিকা বাড়ানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত ৪ মার্চ কাতার এনার্জি প্রথমবারের মতো এলএনজি কার্যক্রম স্থগিত করে এবং সরবরাহে ফোর্স মেজর ঘোষণা করে। এ বিঘ্নের কারণে বৈশ্বিক বাজার থেকে কাতার অধিকাংশ এলএনজি কার্গো সরবরাহ কার্যত সরিয়ে নেয়।
বৈশ্বিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইসিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রফতানি করেছে। অথচ এর আগের বছরের একই সময়ে দেশটি রফতানি করেছিল ৫০৯টি কার্গো। রফতানি কমে যাওয়ায় গ্যাস বিক্রি থেকে কাতার প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার (২০.৭ বিলিয়ন ইউরো) রাজস্ব হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাতার এনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের এলএনজি রফতানি সক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি বাজার সম্পর্কিত গবেষণা ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যৌথভাবে পাকিস্তানের এলএনজি আমদানির ৯৯ শতাংশ, বাংলাদেশের ৭২ শতাংশ এবং ভারতের ৫৩ শতাংশ সরবরাহ করে। এসব দেশে এলএনজির ব্যবহার মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে কেন্দ্রীভূত। সরবরাহ সংকটের কারণে ভারত শিল্প খাতে এলএনজি সরবরাহে রেশনিং বা বরাদ্দ সীমিত করেছে, বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার দিকে ঝুঁকেছে এবং পাকিস্তান জরুরি গ্যাস ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে।