ফরেন পলিসির বিশ্লেষণ

বিক্ষোভ দমনে যেভাবে ইরানকে সাহায্য করছে রাশিয়া

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে রাশিয়া ইরানকে কূটনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে।

প্রকাশ্যে রাশিয়া বরাবরের মতোই ‘বিদেশী হস্তক্ষেপের নিন্দা’, ‘স্থিতিশীলতার আহ্বান’ ও ‘ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান’-এর মতো ভাষা ব্যবহার করছে। কিন্তু আড়ালে মস্কোর ভূমিকা অনেক বেশি গভীর ও কার্যকর। রাশিয়া এখনো ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম, দমনমূলক অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ এবং ভেনিজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর পতনের পর রাশিয়া এখন মধ্যপ্রাচ্যে তার শেষ শক্তিশালী মিত্রকে হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। ইরানে চলমান গণবিক্ষোভ যখন দেশটির ইসলামি শাসনতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন ক্রেমলিন তার পুরনো বন্ধুকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছে। তবে এই সহায়তা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নয়, বরং পর্দার আড়ালে দমন-পীড়নের আধুনিক প্রযুক্তি এবং সমরসম্ভার সরবরাহের মাধ্যমে।

প্রকাশ্যে রাশিয়া বরাবরের মতোই ‘বিদেশী হস্তক্ষেপের নিন্দা’, ‘স্থিতিশীলতার আহ্বান’ ও ‘ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান’-এর মতো ভাষা ব্যবহার করছে। কিন্তু আড়ালে মস্কোর ভূমিকা অনেক বেশি গভীর ও কার্যকর। রাশিয়া এখনো ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম, দমনমূলক অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। আর সেগুলোই ব্যবহৃত হচ্ছে আজকের বিক্ষোভ দমনে।

রাশিয়ার দৃষ্টিতে ইরানের স্থিতিশীলতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির প্রশ্ন নয়; এটি ঘরের ভেতরের ভয় থেকেও জন্ম নেয়া এক হিসাব। রুশ অভিজাতরা গণবিক্ষোভকে দেখেন এক ভয়াবহ ‘সংক্রমণ’ হিসেবে—যা এলিটদের ভাঙন ঘটাতে পারে এবং দ্রুত শাসনব্যবস্থাকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়। এই ভয় গড়ে উঠেছে ২০০০-এর দশকের রঙিন বিপ্লব, ২০১১–১২ সালের রাশিয়ার বিক্ষোভ এবং ২০০৯ সালের ইরানের সবুজ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে।

এই অভিন্ন ভয় থেকেই ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে দমন সহযোগিতার একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে উঠেছে। গত এক দশকে ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে পেয়েছে নজরদারি ও যোগাযোগে আড়ি পাতার প্রযুক্তি, বিক্ষোভ শনাক্ত ও ভাঙার সফটওয়্যার, জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য সংগ্রহের কৌশল ও সংগঠিত প্রতিবাদ নেটওয়ার্ক ভাঙার ডিজিটাল টুল। এসব সহযোগিতা ‘সন্ত্রাসবাদ দমন’, ‘জনশৃঙ্খলা’ ও ‘তথ্য নিরাপত্তা’ এর নামে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বৈধতা পেয়েছে।

২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত রাশিয়া–ইরান সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এতে ‘আন্তর্জাতিক তথ্য নিরাপত্তা’, ‘তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার প্রতিরোধ’ এবং ‘জাতীয় ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা বিনিময়’ এর কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে এটি ইরানের জন্য একটি আইনি ও রাজনৈতিক ছাতা, যার নিচে রাশিয়া আজকের দমনমূলক সহায়তা দিচ্ছে।

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ। ইরানি পুলিশ, বাসিজ বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখনো রুশ নকশাভিত্তিক কালাশনিকভ অস্ত্র ব্যবহার করে। ২০১৬ সালে রাশিয়া একে-১০৩ রাইফেল সরবরাহের পর ইরান সেগুলোর স্থানীয় উৎপাদনও শুরু করে।

২০১৯ সালের ভয়াবহ বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করেছিল—এসভিডি ড্রাগুনভ স্নাইপার রাইফেল, গাড়িতে বসানো পিকেএম মেশিনগান, টি-৭২ ট্যাংক, বিটিআর ও বিএমপি সাঁজোয়া যান। এসব অস্ত্রকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ দমনের উপযোগী করে রূপান্তর করা হয়েছে। হেলিকপ্টারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমআই-১৭ পরিবহন হেলিকপ্টার দিয়ে বাহিনী স্থানান্তর ও ভয় দেখানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমআই-২৮ ‘হ্যাভক’ আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার কেনা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আরও বড় সংঘাতের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে রাশিয়া ইরানকে প্রায় ৪০টি স্পার্টাক এমআরএপি সাঁজোয়া যান সরবরাহ করে। এটি শহরাঞ্চলে দমন অভিযানের জন্য বিশেষভাবে তৈরি।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান অস্ত্র নয়, তথ্য ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ। ৮ জানুয়ারি শুরু হওয়া ইরানের ইন্টারনেট বন্ধ হওয়া ছিল নজিরবিহীন। কারণ ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত সংযোগ ছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও রাষ্ট্রের ব্যাংকিং, সরকারি প্ল্যাটফর্ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সচল ছিল। এই মডেলটি রাশিয়ার কাছ থেকেই শেখা। ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন (ডিপিএ), নেটওয়ার্ক মনিটরিং, ভিপিএন শনাক্তকরণ ও নির্দিষ্ট অ্যাপ ধীর করে দেয়ার মডেলটি রাশিয়াই বিকশিত করেছে। এর ফলে রাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সংযোগ নষ্ট করতে পারে। কিন্তু নিজস্ব প্রশাসনিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখে।

রুশ টেলিকম কোম্পানি প্রোতেই-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান ইরানের মোবাইল অপারেটরদের এই ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। এটি শুধু নজরদারি নয় বরং আগাম প্রতিরোধের উপায় যাতে করে সংগঠকদের শনাক্ত করা যায়। স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও এই ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা নিতে পারেনি। কারণ জ্যামিং, ভয়ভীতি, জব্দ ও আইনি নিয়ন্ত্রণে সেটিও অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এসবের বাইরেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে রাশিয়া ইরানকে কূটনৈতিক সুরক্ষা দিচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা ঠেকানো, সংকটকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে তুলে ধরা এবং পশ্চিমা সমালোচনাকে দুর্বল করার মাধ্যমে ইরানের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া।

তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হামলায় গেলে রাশিয়ার হিসাব বদলাতে পারে। সরাসরি সেনা না পাঠালেও অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য, সাইবার সহায়তা সেক্ষেত্রে আরো বাড়তে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিক্ষোভকারীদের পক্ষে ‘সাহায্য আসছে’ বলে সামরিক হামলার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছেন, তখন মস্কোর জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ছে। রাশিয়া জানে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করার সামর্থ্য বা ইচ্ছা তাদের নেই। তাই তারা ইরানকে ‘ইনসুলেশন’ বা সুরক্ষাবলয় দেয়ার চেষ্টা করছে যাতে ইরান নিজেই নিজের পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। তবে যদি ইরানের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, তবে আসাদ বা মাদুরোর মতো ইরানের নেতাদেরও মস্কো আশ্রয় দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আরও