আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

নেপালে মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা যেভাবে কাজ করছে

দুর্যোগে নিহত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কাঠামো হলো ইন্টারপোলের ডিজাস্টার ভিকটিম আইডেন্টিফিকেশন বা ডিভিআই ব্যবস্থা। মানবদেহের জীবিত কোষের কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় তথ্য ডিএনএ অণুতে থাকে। অভিন্ন যমজ ছাড়া প্রায় প্রত্যেক মানুষের ডিএনএ আলাদা। ফলে নিখোঁজ বা দুর্যোগে নিহত ব্যক্তিদের শনাক্তে এটি কার্যকর পদ্ধতি।

লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের কাছে হিমবাহ ধসে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যার এক সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ১২০০ মরদেহ, যাদের শনাক্তে কাজ করছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।

এসব মরদেহ শনাক্তে এরই মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষা শুরু করেছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। মরদেহ রাখার স্থানগুলো ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিতে এ পদ্ধতির ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজদের প্রথম সারির আত্মীয়— অর্থাৎ বাবা, মা, ছেলে বা মেয়েদের—ডিএনএ প্রোফাইল তৈরির জন্য নতুন করে রক্তের নমুনা দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত নিখোঁজদের স্বজনদের কাছ থেকে শত শত ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

নিখোঁজ বিদেশী নাগরিকদের ক্ষেত্রে তাদের নিজ নিজ দেশে থাকা প্রথম সারির আত্মীয়রাও ডিএনএ পরীক্ষা করাতে পারবেন। পরে পরীক্ষার ফল ই-মেইলে নেপাল পুলিশের কাছে পাঠানো যাবে। সেখানে প্রাপ্ত নমুনার সঙ্গে মরদেহ থেকে সংগৃহীত ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হবে।

সংগৃহীত নমুনা নেপাল পুলিশের ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি এবং নেপাল একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে পাঠানো হচ্ছে।

ডিএনএ পরীক্ষা কেন প্রয়োজন

রাজধানী কাঠমান্ডুয় ফরেনসিক দল মরদেহ শনাক্তে কাজ করছে। তবে দুর্যোগ আঘাত হানার পর নয়দিন পার হওয়ায় অনেক মরদেহে পচন ধরেছে। এ কারণে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার প্রতিবেদক জেসিকা ওয়াশিংটন। তিনি জানান, মরদেহ শনাক্তে ট্যাটু, গয়না বা ব্যক্তিগত সামগ্রী সহায়ক হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকার কারণে অনেক মরদেহ এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে চেহারা দেখে পরিচয় নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার পর দেহ বিকৃত বা পচে গেলে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যেতে পারে। এ কারণেই দুর্যোগের পর মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সাধারণত রক্ত, নরম টিস্যু, হাড় ও দাঁত থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা যায়। সুইডেনের ন্যাশনাল বোর্ড অব ফরেনসিক মেডিসিনের আণবিক জীববিজ্ঞানী কার্স্টিন মন্টেলিয়াস জানান, শরীরের অধিকাংশ টিস্যু পচে গেলেও হাড় থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা সম্ভব।

তিনি জানান, শুধু চেহারা দেখে মরদেহ শনাক্ত করা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর ডিএনএও সময়ের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তাই পরিস্থিতি বিবেচনা করে কখন এবং কোন পদ্ধতিতে নমুনা সংগ্রহ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

ডিএনএ পরীক্ষা কীভাবে করা হয়

দুর্যোগে নিহত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কাঠামো হলো ইন্টারপোলের ডিজাস্টার ভিকটিম আইডেন্টিফিকেশন বা ডিভিআই ব্যবস্থা। মানবদেহের জীবিত কোষের কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় তথ্য ডিএনএ অণুতে থাকে। অভিন্ন যমজ ছাড়া প্রায় প্রত্যেক মানুষের ডিএনএ আলাদা। ফলে নিখোঁজ বা দুর্যোগে নিহত ব্যক্তিদের শনাক্তে এটি কার্যকর পদ্ধতি।

ডিভিআই প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা মরদেহ পরীক্ষা করে যত বেশি সম্ভব বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করেন। মন্টেলিয়াসের মতে, মরদেহ শনাক্তের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তিনটি পদ্ধতি হলো ডিএনএ তুলনা, আঙুলের ছাপ এবং দাঁতের গঠন তুলনা। পরিস্থিতি অনুযায়ী এসব পদ্ধতির যেকোনো একটি বা একাধিক ব্যবহার করা হয়।

নিখোঁজ ব্যক্তির সরাসরি ডিএনএ নমুনা পাওয়া গেলে কাজটি তুলনামূলক সহজ। যেমন- তার ব্যবহৃত টুথব্রাশ বা চিরুনিতে থাকা চুল থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা যায়। পরে মরদেহ থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তা তুলনা করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তির আঙুলের ছাপ বা দাঁতের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায় না। তখন বাবা-মা, সন্তানসহ নিকট আত্মীয়দের ডিএনএ নমুনা ব্যবহার করা হয়। নেপালে এ কাজে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

নমুনা সংগ্রহের পর বিশেষজ্ঞরা স্বজনদের ডিএনএ এবং মরদেহ থেকে পাওয়া ডিএনএর তথ্য তুলনা করেন। এ কাজে বিভিন্ন কম্পিউটারভিত্তিক সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। সফটওয়্যার সম্ভাব্য মিল শনাক্ত করে দেয়, পরে ডিএনএ বিশেষজ্ঞরা তা যাচাই করেন। দুই সেট তথ্যের মধ্যে ১০০ শতাংশ মিল পাওয়া গেলে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

মরদেহ শনাক্তে সহায়তা দিচ্ছে ভারত ও চীন

নেপালে উদ্ধার করা মরদেহ শনাক্তে নেপালকে সহায়তা করছে ভারত ও চীন। দেশটিতে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, ১৯ সদস্যের একটি ফরেনসিক দল দেশটিতে পাঠানো হয়েছে। দলটি নেপাল পুলিশের সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি এবং ন্যাশনাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে নেপালি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণে কাজ করছে। দূতাবাস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ নমুনা দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করাই এ দলের মূল লক্ষ্য।

এদিকে চীনও ডিএনএ শনাক্তকরণে বিশেষজ্ঞদের একটি দল পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি জরুরি ত্রাণসামগ্রীর তৃতীয় চালানও নেপালে পাঠিয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া।

আরও