ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের এক সপ্তাহ পূর্ণ হলো। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে এ যুদ্ধ, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে মধ্য এশিয়া থেকে ইউরোপের সীমানা পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানের নাম দিয়েছে ‘এপিক ফিউরি’, আর ইসরায়েলে এর নাম ‘রোরিং লায়ন’। একে একটি শক্তিশালী সামরিক প্রদর্শনী হিসেবে দাবি করছে উভয় পক্ষ। তবে রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা ছাড়া এর প্রকৃত ফলাফল এখনো অস্পষ্ট।
যুদ্ধের নেপথ্যে কী?
কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে ইরান। এ লক্ষ্যেই তারা লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়েছে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের শত্রপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে।
এর মধ্যে ইরান একটি পারমাণবিক কর্মসূচিও গড়ে তুলেছে, যা তাদের দাবি অনুযায়ী বেসামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু ওয়াশিংটন এ দাবি মানতে নারাজ। তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সীমিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। শনিবার পর্যন্ত ওয়াশিংটন আলোচনার টেবিলে থাকলেও হঠাৎ আলোচনা ত্যাগ করে বোমা হামলা শুরু করে। ইসরায়েলের নীতি বরাবরই ছিল তার শত্রুপক্ষকে (লেবানন, ইরাক, গাজা, ইয়েমেন, সিরিয়া) সামরিক শক্তি ও গুপ্তহত্যার মাধ্যমে দুর্বল রাখা। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বহু বছর ধরে ইরান আক্রমণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহিত করে আসছিলেন। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়ায় এখন পুরো অঞ্চল যুদ্ধের মুখে পড়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কী?
এ যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে সেগুলো পরস্পরবিরোধী। মূল লক্ষ্য হিসেবে ইরান ও তার আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর (যেমন হিজবুল্লাহ ও হুথি) পক্ষ থেকে আসা সাধারণ হুমকি মোকাবেলার কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এ অভিযানের একটি প্রধান স্তম্ভ। এ সামরিক অভিযানের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আকাশপথে ব্যাপক বোমা হামলার মাধ্যমে ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। গত শুক্রবার ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি ইরানের কাছ থেকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ প্রত্যাশা করেন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে নির্মূল করাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। তবে তিনি এও স্পষ্ট করেছেন, এ যুদ্ধের ফলে যদি বর্তমান শাসনের পতন ঘটে, তবে তিনি তাকে পূর্ণ সমর্থন জানাবেন।
এ যুদ্ধের লক্ষ্যের মধ্যে একটি গভীর ধর্মীয় ও কৌশলগত দিকও জড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু খ্রিষ্টান ইভানজেলিকাল গোষ্ঠী এ বোমাবর্ষণকে একটি ‘পবিত্র যুদ্ধ’ বা ‘আরমাগেডন’ হিসেবে দেখছে। যা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী যিশু খ্রিস্টের পুনরাগমনকে ত্বরান্বিত করবে।
এছাড়া একটি কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা কুর্দি যোদ্ধাসহ বিভিন্ন সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করছে। এ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য, দেশের ভেতর থেকে চাপ সৃষ্টি করা, যা শেষ পর্যন্ত একটি অনিশ্চিত ও ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে দেশটিকে ঠেলে দিতে পারে।
বেসামরিক হতাহতের পরিস্থিতি কী?
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই প্রাণহানির সংখ্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সাত দিনে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানে মোট ১ হাজার ৩২০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক হামলাটি ঘটেছে দক্ষিণ ইরানের মিনাব-এ। সেখানে মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা হামলায় কয়েক প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক শিক্ষার্থী।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রেও। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন সাবমেরিন থেকে টর্পেডো হামলা চালানো হয়, যাতে অন্তত ৮৭ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এক চরম মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ২১৭ জন নিহত এবং ৭৯৮ জন আহত হয়েছেন। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এ সংঘাতের নতুন এ পর্যায়ে দেশটিতে কয়েক লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং লেবানন সরকার একটি চরম মানবিক সংকটের বিষয়ে বিশ্বকে সতর্ক করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের পাল্টা হামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জন ইসরায়েলি ও ৬ জন মার্কিন কর্মী নিহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় তাকা মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্রবস্তু করেছে ইরান। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং কুয়েতেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
এখন ইরানের নেতৃত্বে কে?
যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংস্থা দেশ পরিচালনা করছে। খামেনির ছেলে মোজতবাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বড় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও দেশটির সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ এখনো বজায় রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশাল দেশটি যদি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তবে তা খণ্ড-বিখণ্ড বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক ইতিহাস এ ধরনের সামরিক অভিযানের ফলাফল নিয়ে যে সতর্কবার্তা দেয় তা মোটেও ইতিবাচক নয়। ২০০১ সালের আফগানিস্তান যুদ্ধ ও ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে যথাক্রমে তালেবান ও প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটানো সম্ভব হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো চরম ব্যর্থতা হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রেও বর্তমান আক্রমণ একই ধরনের ইতিহাস ফিরিয়ে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরান কতদিন প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারবে?
প্রথাগত সামরিক শক্তিতে ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সমকক্ষ না হলেও, দেশটি অপ্রতিসম যুদ্ধে অত্যন্ত দক্ষ। ইরান ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাদের ড্রোন ও মিসাইল হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো কি নিরপেক্ষ থাকবে?
যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলো কতদিন নিরপেক্ষ থাকতে পারবে, তা বলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তেহরান বারবার সতর্ক করে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত অসংখ্য মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে। এরই মধ্যে এ অঞ্চলের বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেল, বহুতল আবাসিক ভবন, গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরগুলোয় হামলা হয়েছে। এ ক্ষয়ক্ষতিগুলোর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বেশ কয়েকটি শক্তিশালী রাজতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবেই ইরানি শাসনকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হিসেবে দেখে আসছে। তাসত্ত্বেও, তাদের মধ্যে এক গভীর উদ্বেগ কাজ করছে যে, তারা শেষ পর্যন্ত এমন একটি বিধ্বংসী যুদ্ধের জালে জড়িয়ে পড়তে পারে যেখানে কোনো পক্ষই জয়ী হবে না, বরং প্রতিটি পক্ষকেই চরম মূল্য দিতে হবে।
এ যুদ্ধ কি বৈধ?
এ যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। স্পেন ও যুক্তরাজ্যের মতো অনেক পশ্চিমা মিত্র দেশও এর সমালোচনা করেছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এ অভিযানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।