বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম

হরমুজ প্রণালি নিয়ে বৈঠক স্থগিত, ফের কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের অনুরোধে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত তেহরান ও মাসকাট যৌথভাবে নিয়েছে। বৈঠকের জন্য উপযুক্ত একটি তারিখ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করবে ইরান

মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা ফের হোঁচট খেয়েছে। ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের মধ্যে নির্ধারিত একটি বৈঠক স্থগিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অঞ্চলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি তেল পরিবহনপথের আশপাশে নতুন করে হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। খবর রয়টার্স।

বাজারে লেনদেন শুরুর পর আজ জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রফতানিকারক সৌদি আরবের সরবরাহ নিয়ে নতুন হুমকি এতে প্রভাব ফেলেছে। ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি কয়েকদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

অদূর ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমঝোতা হওয়ার আশা আরো ফিকে হয়ে যায় গতকাল রাতে। ওই সময় ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদি জানান, সোমবার আঞ্চলিক পর্যায়ের যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’ স্থগিত করা হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ওই বৈঠকে তারা অংশ নেবেন। হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল কীভাবে পরিচালিত হবে, ওই বিষয়ে সেখানে ওমানের সঙ্গে করা একটি সমঝোতা উপস্থাপন করার কথা ছিল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের অনুরোধে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত তেহরান ও মাসকাট যৌথভাবে নিয়েছে। বৈঠকের জন্য উপযুক্ত একটি তারিখ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করবে ইরান।

এদিকে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালিও এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও গতকাল জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে প্রজেক্টাইলের আঘাত লাগে। এতে আগুন ধরে যায় এবং জাহাজটির নাবিকদের সরিয়ে নিতে হয়।

অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় একজন নিহত ও চার নাবিক আহত হয়েছেন।

আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সৌদি পাইপলাইন চালু না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহের সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এরই মধ্যে প্রতিদিন যে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ থেকে বাদ পড়েছে, হিসাবে এটিও যুক্ত হবে।

পাইপলাইনটির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে সৌদি আরব এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। মেরামতে প্রয়োজনীয় সময় নিয়ে পরস্পরবিরোধী হিসাব দিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। কারো মতে কয়েক দিন, আবার কারো মতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। স্যাটেলাইট ছবিতে পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থানে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী দেখা গেছে।

ছয় মাস আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেটিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতা আবার বেড়েছে। এর আগে গত মাসে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ছিল।

লন্ডনভিত্তিক প্যান-আরব সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ওমানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও তেহরানের দাবিগুলো যুক্তরাষ্ট্র পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে না।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার সময় নির্ধারণ করা লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি। ফেব্রুয়ারিতে ওই অভিযান শুরুর সময় ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান ঘটানো, প্রতিবেশী দেশগুলোয় হামলা চালানোর সক্ষমতা থেকে বিরত রাখা এবং ইরানে শাসকদের উৎখাতের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।

আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়ে গতকাল ট্রাম্প আবারো বলেছেন, এখনো আশা করছেন চলতি বছরই ইরানের যুদ্ধের অবসান হবে। এমনকি নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরেও তা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

হুথিদের হামলা অব্যাহত

সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সর্বশেষ আন্তঃসীমান্ত হামলার ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও প্রকাশ করেছে। ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুথি বিদ্রোহীদের চালানো বলে ধারণা করা ওই হামলায় দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশের কয়েকটি বাড়ি ও একটি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আলাদাভাবে হুথিরা জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এর আগে তারা বাব এল-মানদেবের পেরিম দ্বীপ দখল করে।

লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর হুথিদের অগ্রযাত্রা এবং সৌদি আরবে তাদের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন এক সংকট তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন একদিকে সৌদি মিত্রদের সমর্থন দিতে এবং নৌ চলাচল সুরক্ষিত রাখতে চায়, অন্যদিকে আরেকটি যুদ্ধের ফ্রন্টে জড়িয়ে পড়ার বিষয়েও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। হুথিদের হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোকেও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলেছে—তাদের হয় ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিতে হবে, নয়তো ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র টানা দুই মাস হুথিদের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছিল। তবে গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি তুলে নিয়েছে বলে ঘোষণা দেয়ার পর ট্রাম্প ওই অভিযান বন্ধ করে দেন।

তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে আপাতত ট্রাম্প প্রশাসন তাকে শুধু গোয়েন্দা সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

গত শনিবার ট্রাম্পও স্বীকার করেন যে তিনি যুবরাজের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, হুথিরাও মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওয়াশিংটনকে ইয়েমেনের যুদ্ধে বাইরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

আরও