ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার ছয় মাস পূরণ হয়েছে। এই পুরো সময়জুড়েই আড়ালে রয়ে গেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর দেশটির সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া এই শীর্ষ ধর্মীয় নেতাকে এ পর্যন্ত দেখেছে বা তার কণ্ঠস্বর শুনেছে এমন ইরানির সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। দেশের এমন সংকটের মুহূর্তে শীর্ষ নেতৃত্বের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি তেহরানের শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তীব্র অনিশ্চয়তা ও শূন্যতা তৈরি করেছে।
শুধু তাই নয়, বর্তমানে মোজতবার শারীরিক অবস্থা ও ভূমিকা নিয়ে ক্রমেই জোরালো প্রশ্ন উঠছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ নিয়ে তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। নাজুক অর্থনীতি আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তেলের ওপর টানা কয়েক মাসের রফতানি নিষেধাজ্ঞা দেশটির স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের মূল্যে মারাত্মক ধস নামিয়েছে। এমন এক জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ নেতার ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ দেশটিতে বাড়ছে নানামুখী গুঞ্জন।
তবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে কোনো ছবি, ভিডিও বা সরাসরি কোনো অডিও বার্তা প্রকাশ না পাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ নাগরিক তো বটেই, এমনকি কট্টরপন্থী অনুসারীদের মধ্যেও সংশয় বাড়ছে। ইরানিদের উদ্দেশে মোজতবার বার্তাগুলো এসেছে কয়েকটি লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে। টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপকেরা সেগুলো পড়ে শুনিয়েছেন। এমনকি গত মাসে তার বাবার শেষ বিদায়ের সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা যায়নি।
ইরানি গণমাধ্যম ও বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সূত্রের দাবি, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আঘাতজনিত চিকিৎসার কারণে প্রকাশ্যে না এলেও নেপথ্যে থেকে সরকার পরিচালনা করছেন মোজতবা খামেনি। রাষ্ট্রীয় নীতি ও যুদ্ধ সংক্রান্ত শীর্ষ সিদ্ধান্তগুলো তিনি নিজেই নিচ্ছেন এবং একটি বিশেষ জ্যেষ্ঠ গোষ্ঠীর ওপর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার ভার ছেড়ে দিয়েছেন। ১০ আগস্ট দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও দাবি করেন, তিনি সর্বোচ্চ নেতার সাথে প্রায় ৭ ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক সম্পন্ন করেছেন।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতানকা রয়টার্সকে জানান, প্রশ্নটি এখন আর মোজতবা খামেনি বেঁচে আছেন কি না তা নিয়ে নয়, বরং আসল প্রশ্ন হলো ইরান পরিচালনা করার জন্য বাস্তবে কোনো কার্যকরী সর্বোচ্চ নেতা বহাল আছেন কি না।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত শহর কোমে বাসিজ বাহিনীর এক সদস্য বলেন, আমাদের নেতার কণ্ঠ শুনতে হবে। অথবা অন্তত এমন কোনো প্রমাণ দেওয়া উচিত, যা দেখে মনে হবে তিনি আছেন এবং দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এতে আমাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় বাসিজ বাহিনীর ওই সদস্য নাম প্রকাশ করতে চাননি। কিছুটা সংশয় থাকলেও তিনি মনে করেন, মোজতবাই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। একইসঙ্গে স্বীকার করেন, একটি ছবিও প্রকাশ না হওয়ায় সমর্থকদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, শাসনব্যবস্থার বিরোধী ও সংস্কারপন্থীরা মোজতবার আড়ালে থাকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন। এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মোজতবা যে নিহত হননি, সেটি আমরা কীভাবে নিশ্চিত হবো? তিনি যে জীবিত আছেন, এর পক্ষেও তো কোনো প্রমাণ নেই। বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবার এই অনুপস্থিতির ফলে দেশটির সামরিক ও শাসন কাঠামোর মূল নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের হাতে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মতো নীতিগত চুক্তি কিংবা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত বজায় রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মোজতবার স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় ধরে তার আড়ালে থাকার এই সুযোগে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও অনুসারীদের মধ্যেও চরম বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
ইরান তার সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রুদের সঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধ সহ্য করে ক্ষতবিক্ষত হলেও দাঁড়িয়ে আছে। রীতিমতো টিকে আছে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাও। এছাড়াও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার এবং উপসাগরীয় মার্কিন সহযোগীদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা এখনো রয়েছে তাদের। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, ভেঙে না পড়ে একজন সর্বোচ্চ নেতা ও জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের ক্ষতি সামলে নিতে পারে এবং ধর্মীয় আদর্শের প্রতি অনুগত একটি রাজনৈতিক ও সামরিক চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে পারে। তবে সংঘাতের ব্যয় এবং তেল রফতানিতে মাসের পর মাস অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মান ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এ অবস্থায় শাসকগোষ্ঠী নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে। তাদের লক্ষ্য রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা, প্রতিরোধক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে দেশকে অস্থিতিশীল হতে না দেয়া।
সূত্রগুলো বলছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদকে ঘিরে একটি কাঠামো গড়ে উঠেছে। সেখানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। ক্ষমতা কাঠামোর এই স্তরে আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো রাজনৈতিক নেতারা আছেন।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছেন, মোজতবা এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত আছেন। সব বড় সিদ্ধান্তেও তার চূড়ান্ত অনুমোদন আছে।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তি মোজতবার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পান। তার কোনো তথ্য বা ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র এখনও লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
মোজতবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ মহলের একজন। ওই ব্যক্তির ভাষ্য, সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক অবস্থারও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, সমস্ত চাপ সত্ত্বেও জনগণের সেবা বন্ধ হয়নি। আমাদের পররাষ্ট্র নীতি একমুখী এবং আমাদের সিদ্ধান্তগুলো সুসংগত। এই সবই দেখায় যে সর্বোচ্চ নেতাই দায়িত্বে রয়েছেন।
যুদ্ধের আগেও খামেনি তার বাবার শীর্ষ সহযোগী হিসেবে পর্দার আড়ালের ভূমিকা পছন্দ করতেন এবং প্রকাশ্য মনোযোগ এড়িয়ে চলতেন। জ্যেষ্ঠ সূত্র অনুসারে, ২৮ ফেব্রুয়ারির ভোরের দিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শুরু করার পর তার বাবা নিহত হন এবং তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।
ভাতানকা বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো চুক্তির জন্য মোজতবার স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন, একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাত বজায় রাখার সিদ্ধান্তের জন্যও তা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো প্রত্যেকেই দাবি করতে পারে, নেতা আসলে কী চান তা তারা জানেন।