২০২৪ সালে অন্তত ১১২টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে ইরান

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপ, ভরসা চীন ও প্রতিবেশীরা

২০২৪ সালে অন্তত ৮৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে ইরান। এ তালিকায় শীর্ষে ইউএই। দেশটি থেকে ইরানের আমদানি হয়েছে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের, যা মোট আমদানির ৩০ শতাংশের কিছু বেশি

ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরো সংকুচিত করতে নতুন দফায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ঘোষিত এ নিষেধাজ্ঞায় প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচল, স্বর্ণ, বিমান, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সম্পদের মতো খাতেও বাড়ানো হয়েছে পরোক্ষ বা সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার আওতা।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, তেহরান সরকারকে টিকিয়ে রাখা সব ধরনের অর্থনৈতিক পথ বন্ধ করাই এ অভিযানের লক্ষ্য। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের নেতাদের ফোন করে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধের বিষয়ে নির্দিষ্ট আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে কোন দেশকে এ বিষয়ে চাপ দেয়া হচ্ছে বা এর জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে কিনা, তা জানানো হয়নি।

দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বাণিজ্যিক নির্ভরতা ক্রমেই ইউরোপ থেকে সরে এশিয়া ও আঞ্চলিক অংশীদারদের দিকে গেছে। সরকারি কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অন্তত ১১২টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে ইরান। তবে এ পরিসংখ্যানে দেশটির তেল রফতানির বড় একটি অংশ অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

ইরানের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার চীন। ২০২৪ সালে চীনে ১৪ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে তেহরান। ট্যাংকার ট্র্যাকিং বিশ্লেষকদের হিসাবে, সমুদ্রপথে ইরানের রফতানি করা অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনছে। এর বড় অংশই ছাড়মূল্যে এবং ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন নৌবহরের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। ফলে সরকারি কাস্টমসের হিসাবে প্রকৃত তেল বাণিজ্যের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।

রফতানি বাজার হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইরাক। দেশটিতে ২০২৪ সালে ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে ইরান। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইরাকে গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন প্রদেশে সরাসরি বিদ্যুৎও সরবরাহ করে তেহরান। খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী ও বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্যও ইরাকের বাজারে যায়।

তৃতীয় বৃহত্তম রফতানি অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ২০২৪ সালে দেশটিতে ইরানের রফতানি ছিল ৭ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘদিন ধরে ইউএই ইরানের জন্য আর্থিক ও পুনঃরফতানির গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে কাজ করেছে। চতুর্থ অবস্থানে থাকা তুরস্কে রফতানি হয়েছে ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। তুরস্কে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি পেট্রোকেমিক্যাল, খাদ্য ও নির্মাণসামগ্রী রফতানি করে ইরান। আফগানিস্তানে রফতানির পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

আমদানিতে ইউএই ও চীন

২০২৪ সালে অন্তত ৮৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে ইরান। এ তালিকায় শীর্ষে ইউএই। দেশটি থেকে ইরানের আমদানি হয়েছে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের, যা মোট আমদানির ৩০ শতাংশের কিছু বেশি। এসব পণ্যের বড় অংশই ইউএইর নিজস্ব উৎপাদন নয়; পুনঃরফতানির মাধ্যমে ইরানে যায়। এর ফলে পশ্চিমা যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও ভোক্তা পণ্যে পরোক্ষভাবে প্রবেশাধিকার পেত তেহরান।

আমদানির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস চীন। ২০২৪ সালে চীন থেকে ইরান ১৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, যানবাহন ও শিল্পের বিভিন্ন উপকরণের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী চীন।

তৃতীয় অবস্থানে তুরস্ক। দেশটি থেকে ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে ইরান। দুই দেশের অভিন্ন স্থলসীমান্ত ও দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, যানবাহন ও উৎপাদিত পণ্য সরবরাহে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের আমদানির পরবর্তী বড় উৎস ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে দেশটি। এর বড় অংশ ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি। তবে ২০১৮ সালের আগের তুলনায় ইউরোপের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য এখন অনেক কম।

ভারত থেকে ইরানের আমদানি ছিল ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুই দেশের বাণিজ্য কমেছে এবং বর্তমানে এর বড় অংশ কৃষিপণ্য—বিশেষ করে চাল, চা ও ওষুধকেন্দ্রিক।

ফলে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের ওপর চাপ বাড়লেও দেশটির অর্থনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সহজ হবে না। চীন, ইউএই, তুরস্ক ও ইরাকের মতো অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কই এখন ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে এসব বাণিজ্যপথে যুক্তরাষ্ট্র কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তার ওপরই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।

আরও