ব্রাদার্স গ্রিমের রূপকথায় আমরা যে 'বিগ ব্যাড উলফ' বা ভয়ংকর নেকড়ের গল্প শুনে বড় হয়েছি, তা জার্মানির অরণ্য পেরিয়ে এখন দেশটির সংসদ ভবনে মূল আলোচনার বিষয়। দীর্ঘ তিন দশক সুরক্ষিত থাকার পর জার্মানিতে নেকড়ে শিকার বৈধ করার পথে হাঁটছে দেশটির সরকার।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুসারে, সম্প্রতি জার্মানির নিম্নকক্ষ পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত একটি খসড়া আইন পাস হয়েছে, যা দেশটির পরিবেশ রক্ষা বনাম খামারিদের জীবিকার চিরাচরিত লড়াইকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
নেকড়ে শিকার বৈধ করার এ সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হলো গবাদি পশুর ওপর ক্রমাগত হামলা। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে জার্মানিতে নেকড়ের আক্রমণে মারা গেছে বা আহত হয়েছেপ্রায় ৪ হাজার ৩০০টি গবাদি পশু।
খামারিদের মতে, এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং তাদের বেঁচে থাকার ওপর এক বড় আঘাত। বুনো নেকড়েদের আক্রমণ গ্রামীণ এলাকায় তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিপদ থেকে বাঁচতে অনেকেই এখন নেকড়ে শিকারকেই একমাত্র সমাধান বলে মনে করছেন।
নেকড়ে শিকারের আইন বদলানোর পেছনে একটি বিশেষ ঘটনার বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২২ সালে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের প্রিয় ছোট ঘোড়া (পনি) ডলি নেকড়ের হামলায় মারা যায়। এ ঘটনার পর থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়া পরিবেশ আইন শিথিল করার দাবি জোরালো হয়। এছাড়া এএফডির মতো কট্টর ডানপন্থী দলগুলো নেকড়ে শিকারকে রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আসন্ন নির্বাচনে বেশি ভোট পাওয়ার জন্য এটি এখন তাদের কাছে বড় একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন আইন অনুযায়ী, জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় নেকড়ে শিকারের অনুমতি দেয়া হবে। এছাড়া যেসব নেকড়ে আগে খামারে হামলা করেছে, সেগুলোকে যেকোনো সময় গুলি করা যাবে।
তবে জার্মানির সবচেয়ে পুরোনো পরিবেশবাদী সংগঠন নাবু এ সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ করেছে। তাদের মতে, নেকড়ে হত্যা কোনো সমাধান নয়। এর বদলে খামারে আধুনিক বেড়া দেয়া এবং পাহারাদার কুকুরের সংখ্যা বাড়ানোই প্রকৃত সমাধান হতে পারে। আইনটি রাজনীতিবিদদের লোকদেখানো বড় চাল বলে মনে করছে সংগঠনটি।
শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি রক্ষা না কি মানুষের নিরাপত্তা—এ দুইয়ের মাঝখানে জার্মানি এখন এক কঠিন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। বন্যপ্রাণী ও মানুষের এ চিরন্তন লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার জয় হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।