দ্য টেলিগ্রাফ

মাদুরো আটক ও ট্রাম্পের ‘মনরো ডকট্রিন’: কী বার্তা পেল মস্কো ও বেইজিং

অনেকের মতে, মস্কো ও বেইজিং বরং এটিকে প্রমাণ হিসেবে দেখছে যে, ট্রাম্প আঞ্চলিক পর্যায়ে শক্তি প্রদর্শনে আগ্রহী হলেও বৈশ্বিক সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক।

ট্রাম্পের এই কৌশলকে অনেকে ‘মনরো ডকট্রিন’-এর আধুনিক সংস্করণ বা ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী পুলিশের ভূমিকা পালনের চেয়ে নিজের ‘উঠানে’ অর্থাৎ পশ্চিম গোলার্ধে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ফেরাতে বেশি আগ্রহী। এই বার্তা চীন ও রাশিয়ার কাছে স্পষ্ট—আমেরিকা তার আশপাশে কোনো বিদেশী শক্তির উপস্থিতি সহ্য করবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন ঠিক একটি নেটফ্লিক্স সিরিজের দৃশ্যই উপহার দিলেন। নাটকীয় এক অভিযানে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন তুলেছে।

খুব কম বিশ্লেষকই বিশ্বাস করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ‘সার্জিক্যাল অপারেশন’ সফলভাবে চালাতে পারবে। ভেনিজুয়েলা আয়তনে বড়, শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও সরকারপন্থী মিলিশিয়ায় সুরক্ষিত একটি দেশ। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এমন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় ও বড় মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৮৯ সালে পানামা আক্রমণের পর দেশটির শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের লেগেছিল দুই সপ্তাহ, প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু মানুষ।

এর বিপরীতে, মাদুরোকে সস্ত্রীক আটকের এই অভিযান অভূতপূর্ব দ্রুততায় সম্পন্ন হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভেনিজুয়েলার ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতর থেকেই কেউ একজন যুক্তরাষ্ট্রকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে। গোটা ঘটনাটি অনেকের কাছেই ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অভিযানের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে।

এই অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প নিজেকে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন—যিনি প্রয়োজনে সরকার উৎখাতেও দ্বিধা করেন না। ট্রাম্প প্রশাসন একে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবেও তুলে ধরছে।

ট্রাম্পের এই কৌশলকে অনেকে ‘মনরো ডকট্রিন’-এর আধুনিক সংস্করণ বা ‘ডনরো ডকট্রিন’ বলছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী পুলিশের ভূমিকা পালনের চেয়ে নিজের ‘উঠানে’ অর্থাৎ পশ্চিম গোলার্ধে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ফেরাতে বেশি আগ্রহী। এই বার্তা চীন ও রাশিয়ার কাছে স্পষ্ট—আমেরিকা তার আশপাশে কোনো বিদেশী শক্তির উপস্থিতি সহ্য করবে না।

এ ধরনের ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ অতীতে কেবল সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরাই প্রয়োগ করেছে। ফলে ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ মস্কো ও বেইজিংয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। রাশিয়া ও চীন উভয় দেশই মাদুরো সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল। মাদুরোর পতনের ফলে দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাব এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ ঘটনাকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন নিজে যেখানে আন্তর্জাতিক আদালতের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে চলছেন, সেখানে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া তাকে ব্যক্তিগতভাবে বিচলিত করেছে। এছাড়া ভেনেজুয়েলায় রাশিয়ার বিশাল তেল ও সামরিক বিনিয়োগ এখন অনিশ্চিত।

বেইজিং এ ঘটনাকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। বেইজিংয়ের কাছে ভেনেজুয়েলা ছিল লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রধান কৌশলগত ঘাঁটি। মাদুরোকে তুলে নেয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি চীনা বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, যা বেইজিংয়ের জন্য আরো বেশি অপমানজনক।

এই অভিযানের প্রভাব পুরো অঞ্চলে পড়বে। অনেক দেশই আশঙ্কা করছে, শীতল যুদ্ধের পর যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের যুগ শেষ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছিল, তা আবার ফিরে আসছে। কিউবা ও নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে পড়তে পারে, বিশেষ করে যদি তারা ভেনেজুয়েলার ভর্তুকিযুক্ত তেল হারায়। রাশিয়া ও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভেনেজুয়েলার তেল খাতে রুশ কোম্পানিগুলোর বড় বিনিয়োগ রয়েছে এবং চীন দেশটির সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিচ্ছে, মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রধান জ্বালানি অংশীদার হতে চায়।

তবে সব বিশ্লেষক মনে করেন না যে, রাশিয়া ও চীন এই ঘটনায় আতঙ্কিত হবে। অনেকের মতে, তারা বরং এটিকে প্রমাণ হিসেবে দেখছে যে, ট্রাম্প আঞ্চলিক পর্যায়ে শক্তি প্রদর্শনে আগ্রহী হলেও বৈশ্বিক সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক। ইউক্রেন যুদ্ধ বা তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান তাদের এই ধারণাকে আরো জোরালো করেছে।

ডিসেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নথিতে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ও প্রভাববলয়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। যদি মস্কো ও বেইজিং মনে করে যে, যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নেতৃত্ব থেকে সরে এসে কেবল নিজ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে মনোযোগ দিচ্ছে, তবে তারা আরো সাহসী হয়ে উঠতে পারে—যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। যেমন, বেইজিং এখন ভাবতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলায় ঢুকে সরকার পরিবর্তন করতে পারে, তবে চীনও তাইওয়ানের ক্ষেত্রে একই পথে হাঁটার অজুহাত পাবে। অন্যদিকে, রাশিয়া এই ঘটনাকে ব্যবহার করে ইউক্রেনে তাদের নিজস্ব কার্যক্রমের বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করবে।

মস্কো ও বেইজিং এখন এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা দেখার আশা করতে পারে—যে ব্যবস্থা গড়ে উঠবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাববলয়ের ওপর ভিত্তি করে। তাদের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে বৈশ্বিক পুলিশ হিসেবে তার ভূমিকা থেকে সরে এসে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক দুর্গের আড়ালে অবস্থান নিচ্ছে। বহুদিন ধরে যে বহুমেরুভিত্তিক বিশ্বের স্বপ্ন তারা লালন করে আসছে, সেটির ভোর হয়তো শেষ পর্যন্ত উপস্থিত।

আরও