ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব থেকে মার্কিন দূতাবাসের জরুরি নয় এমন কর্মীদের সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নিজেদের উপস্থিতি কমাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। স্থানীয় সময় বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির একজন কর্মকর্তা ও একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা।
এদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, সৌদি আরবে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন—এমন মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এ নির্দেশ শুধু সৌদি আরবের জন্য প্রযোজ্য।
সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের কার্যক্রম সীমিত করে কর্মীসংখ্যা কমিয়েছে। তবে সেসব দূতাবাসের কর্মীদের বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। ‘রেস্ট্রিকটেড অপারেশনস’ বা সীমিত কার্যক্রমের এ ব্যবস্থায় দূতাবাসগুলো পুরোপুরি বন্ধ না করেই কর্মী ও সেবা কমাতে পারে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের উত্তেজনা বৃদ্ধির পর গত আগস্টে এ ব্যবস্থা চালু করেছিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
সৌদি আরবে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন গত সপ্তাহের শেষে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে। হুথি হামলার আশঙ্কায় এসব দেশে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক থাকতে এবং সম্ভাব্য ভ্রমণ বিঘ্নের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেয়া হয়।
পিগট বলেন, ইরান-সমর্থিত হুথিরা সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বাড়িয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে বেসামরিক মানুষ হতাহত হওয়ার পাশাপাশি যাতায়াতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুথিরা। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও ছিলেন।
এদিকে হুথিদের ওপরও হামলা অব্যাহত রেখেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। তাদের দাবি, সোমবার ও মঙ্গলবার তারা হুথিদের একাধিক ড্রোন প্রতিহত করেছে। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানায়, দেশটির শায়বাহ তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলার চেষ্টা ঠেকিয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। তবে ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুজন নিহত ও দুজন আহত হন। তবে হামলাটি কারা চালিয়েছে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কিছু জানায়নি।
ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড বাড়ানোর চেষ্টা করছে হুথিরা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গোষ্ঠীটি দেশটির রাজধানী সানাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে।
সৌদি আরবের কয়েকজন কর্মকর্তা হুথিদের কর্মকাণ্ডের জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন। তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে গোষ্ঠীটির। তবে সংঘাতের সাম্প্রতিক বিস্তারে নিজেদের ভূমিকা থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান।
হুথিদের হামলা সৌদি আরবের বাইরেও বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। কারণ, ইয়েমেনের কাছে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরো বেড়েছে।
মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রাষ্ট্রদূত মারওয়ান আলী নোমান সতর্ক করে বলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে তারা হামলা অব্যাহত রাখতে পারে। তার মতে, হুথিদের হুমকি ও ঝুঁকি আরো বিস্তৃত হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে ইয়েমেন সরকার।
এদিকে যুক্তরাজ্য সৌদি আরবকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষায় সামরিক সহায়তাও রয়েছে। তবে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তা করতে পারি।’
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প আরো বলেন, হুথিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ রয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। তবে হুথিদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘খুবই খারাপ’ বলে মন্তব্য করেন।