ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত একটি এলএনজি ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। আজ ভোরের ওই ঘটনায় জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী। খবর এপি।
পারস্য উপসাগরের সংকীর্ণ প্রবেশমুখ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে সর্বশেষ হামলা এটি। শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার পর ওই এলএনজি ট্যাংকারের ওপর হামলা চালানো হয়। তবে হামলার দায় সরাসরি স্বীকার করেনি তেহরান।
দেশটি বারবার ঘোষণা দিয়ে আসছে, হরমুজ প্রণালিতে শুধু ইরান অনুমোদিত নৌপথই নিরাপদ। ওমান উপকূলঘেঁষা বিকল্প পথ ব্যবহার করা অন্যান্য জাহাজেও ইরানের হামলার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। তাদের লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করা, তেহরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো। তবে এর আগে প্রণালিতে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালায়, যার জবাবে ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। ফলে আবারো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা স্থগিত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুদ্ধে নিহত খামেনির জানাজায় অংশ নেয়া শোকাহত মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে স্লোগান শোনা গেছে।
গতকাল রাতে আলী খামেনির মরদেহ শিয়া ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র কোম শহরে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ সেখানে হাজারো মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের লিমাহ এলাকার কাছে হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারটিতে আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্রটি। প্রণালি পেরিয়ে দক্ষিণমুখে ওমান উপসাগরের দিকে যাওয়ার সময় জাহাজটির বাম পাশে আঘাত লাগে।
ইউকেএমটিও জানায়, এ হামলায় কোনো পরিবেশগত ক্ষতি হয়নি এবং বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে, কাতার থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী ওই ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে তেহরান। তবে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো দায় স্বীকার করা হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড সতর্ক করে জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জ্বালানি তেলবাহী জাহাজকে অবশ্যই ইরান অনুমোদিত নৌপথ ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দেয়, প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর যেকোনো হস্তক্ষেপের জবাব হবে ‘দ্রুত ও কঠোর’। আর গতকাল হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘চুক্তি করুন, নইলে আমরা কাজ শেষ করে দেব।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি চুক্তিই করতে চাই, কারণ ৯ কোটি ১০ লাখ মানুষের ক্ষতি করতে চাই না। কিন্তু চাইলে আমরা এক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের সেতুগুলো ধ্বংস করতে পারি। তাদের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাও অচল করে দিতে পারি।’
একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের ফি ছাড়াই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছিল। তবে ইরান জোর দিয়ে বলেছে, নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে এবং পরবর্তীতে প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায় করা হবে। এতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন আসে।
যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অনেক আরব দেশ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য ইরানকে কোনো ধরনের অর্থ প্রদানে তারা সম্মত নয়। এর আগে ওমান ও জাতিসংঘের একটি সংস্থা ওমান উপকূলঘেঁষা নতুন নৌপথ চালুর উদ্যোগ নিলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলার ঘটনা ঘটে, যা অঞ্চলের উত্তেজনার মাত্রা আরো স্পষ্ট করে তোলে।
জাহাজ চলাচলবিষয়ক তথ্যপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, গত সপ্তাহান্তে বিভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করে অন্তত ১০৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।