প্রস্তাবিত চুক্তিতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে ইরান

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা না হলেও মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে ইরান। গত সপ্তাহে দেয়া ওমানের একটি প্রাথমিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল তেহরান। তাদের অভিযোগ, ওই প্রস্তাবে তেহরানের ভূমিকা খুবই সীমিত রাখা হয়েছিল।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর তেহরানকে নিয়ন্ত্রণ দেয়ার বিষয়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে ওমান। এতে সম্মত হলে তা হবে ইরানের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ছাড়। বুধবার রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক দুই প্রতিনিধি এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। খবর রয়টার্স।

তবে ইরানের দাবির কাছে পশ্চাদপসরণের আভাস পাওয়া গেলেও প্রণালিটি খুলে দেয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে চুক্তির দাবি করছেন, তা নাকচ করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তাদের মতে, চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু শর্তে এখনো ঐকমত্য বাকি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যপ্রাচ্যের এক জ্যেষ্ঠ কূটনৈতিক প্রতিনিধি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ দেয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একপ্রকার ছাড় দেয়া হয়েছে। আরেক সূত্র জানায়, ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে তা নির্ধারণ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিরা চাচ্ছেন, জাহাজ পরিদর্শনের বিষয়টি আঞ্চলিক দেশগুলো পর্যবেক্ষণ করবে এবং ফি দেয়ার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি ঐচ্ছিক রাখা হবে।

ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী এ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে। তবে উপসাগর থেকে বের হয়ে যাওয়া জাহাজের ওপর ইরানের কর্তৃত্ব কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। তবে সার্বিক বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ জ্বালানি পরিবহন পথ ইরানের নিয়ন্ত্রণে যায়—এমন কোনো প্রস্তাব ওয়াশিংটন মেনে নেবে না। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি দাবি করেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ থামাতে একটি চুক্তি খুব শিগগিরই হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ভোটারই বর্তমান সরকারের এ যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

লোহিত সাগরে হামলার পর বিশ্ববাজারে বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে একটি সৌদি ট্যাংকারে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে অব্যাহত এ উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনো জুলাইয়ের শুরুর দিকের সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প নতুন আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত দেয়ায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে।

তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা না হলেও মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে ইরান। গত সপ্তাহে দেয়া ওমানের একটি প্রাথমিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল তেহরান। তাদের অভিযোগ, ওই প্রস্তাবে তেহরানের ভূমিকা খুবই সীমিত রাখা হয়েছিল।

ইতিবাচক আলোচনার দাবি ট্রাম্পের

মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, সংকট নিরসনে ‘আলোচনা চমৎকারভাবে এগোচ্ছে’ এবং মঙ্গলবারেও দিনভর বৈঠক হয়েছে। তিনি আরো বলেন, খুব দ্রুতই হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হবে। তবে ইরান যদি আবার চুক্তি থেকে সরে আসে, তবে তাদের অত্যন্ত কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

ইরানে ‘ব্যাপক সামরিক হামলা’ থেকে সরে আসার কারণ হিসেবে এসব আলোচনার অগ্রগতিকেই উল্লেখ করছেন ট্রাম্প। যুদ্ধের শুরু থেকেই তিনি এমন অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করে আসছেন। তবে শিগগিরই কোনো চুক্তির সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে ইরানি সূত্রগুলো। তারা জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন।

এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, আলোচনা অব্যাহত থাকলেও ওমানের সঙ্গে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে বলাটা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। সামান্য ভুলের কারণেই বড় ধরনের চুক্তি ভেস্তে যেতে পারে। ট্রাম্পের একটি সাধারণ বার্তার কারণেও পুরো প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে।

আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের আভাস

হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশে ইরানকে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ দেয়া হলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘোষিত সামরিক কৌশলের বড় ধরনের পরাজয়। কেননা যুদ্ধের আগে নৌপথটি সবার জন্য অবাধ ছিল এবং সেখানে কোনো ধরনের ফি দিতে হতো না।

সামরিক অভিযানের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ দাবি করলেও বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন ভোটারের বিরোধিতার মুখে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন।

ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে পণ্যমূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি চেয়েছে তেহরান। ওমান সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ ফি নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে, আর ওয়াশিংটন সম্পূর্ণ ফি-মুক্ত চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তবে কৌশলগতভাবে ফি প্রদানকে ‘স্বেচ্ছাধীন’ হিসেবে রূপ দেয়া হলেও ইরানের সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিতে কোনো শিপিং কোম্পানিই ফি না দিয়ে পারাপারের ঝুঁকি নেবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের দুই সপ্তাহের বিমান হামলাসহ দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক প্রচেষ্টা হরমুজের ওপর তেহরানের প্রভাব কমাতে পারেনি। এর মধ্যেই গোলাবারুদ ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের স্বল্পতার কথা স্বীকার করেছে মার্কিন সামরিক দপ্তর।

অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক চাপ বাড়ার জবাবে ইরান ও ইয়েমেনের হুতিরা সমুদ্রপথে তাদের তৎপরতা জোরদার করেছে। হুতিদের হামলায় ইয়েমেন উপকূলে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যদিও এর ১৪ জন ক্রুকেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

আরও