সম্প্রতি নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালেন্দ্র শাহের শপথ গ্রহণ ও দেশটির পার্লামেন্টে একঝাঁক তরুণ আইনপ্রণেতার উপস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে এ ঘটনা হয়ে উঠেছে আক্ষেপের। তাদের মধ্যে একজন উমামা ফাতেমা।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের বিক্ষোভে অংশ নেয়া হাজার হাজার জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের একজন উমামা। নেপালের তরুণ প্রজন্মের মতো করে তারাও উত্তাল বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে নেপালের মতো সাফল্য পায়নি বাংলাদেশের তরুণরা। বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এতে বলা হয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু তরুণদের হাতে গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আশানুরূপ ফল পায়নি। অন্যদিকে, নেপালে গত নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে মাত্র চার বছরের পুরনো দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। এ জয়ের ফলে জেন-জি প্রজন্মের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি পার্লামেন্টে জায়গা করে নিয়েছেন। আর দেশটির নেতৃত্বে এসেছেন আরএসপির সঙ্গে জোট করা সাবেক র্যাপার বালেন্দ্র শাহ।
রাজনীতিতে নেপালের তরুণদের এ উত্থান এশিয়ায় বিরল ইতিহাস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এখানে অনেক জেন-জি আন্দোলন হয়েছে। তবে নেপালের মতো করে তরুণদের সরাসরি শাসনক্ষমতায় যাওয়ার ঘটনা আর কোথাও দেখা যায়নি।
উমামা ফাতেমা বিবিসিকে বলেন ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি ভীষণ হতাশ হয়েছি। নেপালের তরুণেরা যেভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পেরেছে, তা দেখে নিজের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ না হয়ে পারিনি’
তিনি আরো বলেন ‘বাংলাদেশ এমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। আমরা আমাদের দেশকে সেভাবে সংগঠিত করে নতুন করে গড়ে তুলতে পারিনি—এটা উপলব্ধি করা স্বাভাবিকভাবেই হতাশার।’
একই প্রসঙ্গে নেপালের তরুণ নেতারা বলছেন, তাদের এ সাফল্যের মূল কারণ সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ। কৈলালি এলাকায় জয় পাওয়া আরএসপির প্রার্থী কেপি খানাল বলেন, ‘দেশ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা গভীর ক্ষোভকে সামনে নিয়ে এসেছিল জেন-জি বিক্ষোভ। একই সঙ্গে জেন-জিদের ত্যাগ আর কণ্ঠস্বর মানুষের মনে থেকে গেছে—তারা সেগুলো ভুলে যাননি’
কেপি খানাল মনে করেন, ধারাবাহিকতাও জয়ের ক্ষেত্রে বড় একটি কারণ। তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার জবাবদিহি ও ন্যায়ের কথা তুলে ধরেছি, আর ধীরে ধীরে সেই বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এ আন্দোলনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছিল এবং তারাও সেখানে যুক্ত হতে চাইল।’
তবে তরুণদের জয়ের নেপথ্য হিসেবে নেপালের বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তরুণদের বিচক্ষণ সিদ্ধান্তগুলোর কথাও উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।
গত ১৭ বছরে ১৪টি সরকার পেয়েছে নেপাল। দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থায় বরাবরাই জোট সরকার সুবিধা পেয়ে আসছে। অনেক বছর ধরে সেখানে কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দেশ শাসন করতে পারেনি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত দলের পরিবর্তনশীল জোট ও কয়েকজন রাজনীতিক পালাক্রমে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সমালোচকেরা একে রাজনৈতিক ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল জেন-জি আন্দোলনে। আর এ ক্ষোভই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি থেকে জনগনণকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ফলে তুলনামূলকভাবে নতুন দল ‘আরএসপি’ জনগণের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টমিনিস্টারের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেমোক্রেসি’-র পরিচালক নিতাশা কাউল উল্লেখ করেন, নেপালের ক্ষেত্রে যেহেতু তিনটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের কোনোটিই এককভাবে প্রভাবশালী ছিল না এবং প্রতিটি দলই জনগণের আস্থা হারিয়েছিল, তাই এর প্রধান সুফল ভোগ করেছে তরুণদের দল আরএসপি ও তাদের নেতা।
দলটির সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে—বালেন্দ্র শাহ ও আরএসপির জোট করা এবং দলটিতে বহু তরুণ কর্মী ও আন্দোলনের নেতাদের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত। তরুণ প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও ভোটারের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিয়েছে আরএসপি । অনেকের মতে, এ জোট আরএসপিকেও সুবিধা দিয়েছে। দলটির নেতা রবি লামিছানে তহবিল তছরুপের অভিযোগে বিতর্কের মধ্যে ছিলেন। বালেন্দ্র শাহর সঙ্গে হাত মেলানোর মাধ্যমে দলটি সেই বিতর্ক কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।
নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমিশ মুলমি বলেন ‘দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে দলীয় সংগঠন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি তরুণ নেতৃত্বাধীন দলকে নির্বাচনে বড় সাফল্য পেতে হলে আগে বিস্তৃত একটি দলীয় কাঠামো গড়ে তুলতে হয়, বিশেষ করে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে।’
গত বছরের জেন-জি আন্দোলনের পর বন্ধুদের কাছ থেকে নতুন দল গঠনের প্রস্তাব পাওয়ার সময় তরুণ কর্মী পুরুষোত্তম সুপ্রভাত যাদব ঠিক এ বিষয়ই মাথায় রেখেছিলেন। বিবিসিকে যাদব বলেন, নির্বাচনে জেতা কোনো সহজ বিষয় নয়। আন্দোলন গড়া আর নির্বাচনে জয় পাওয়া—দুটি ভিন্ন বিষয়। একটি রাজনৈতিক দল হুট করে গঠন করা যায় না। এর জন্য বড় ধরনের কাঠামো দরকার। তখন আমাদের অর্থ জোগাড় করা ও সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল। ওই সময় আমাদের সেই সক্ষমতা ছিল না।
যাদবের সিদ্ধান্তটি যে সঠিক ছিল তা এখন প্রমাণিত। গত সপ্তাহে আইনপ্রণেতা হিসেবে শপথ নিয়েছেন যাদব।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। জেন-জি আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের গবেষণা ফেলো ইমরান আহমেদ মনে করেন, দলগুলো নিজেদের সংস্কারমুখী হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। সেইসঙ্গে তরুণ আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল তারা। বিপরীতে তরুণদের নতুন দলগুলো প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর প্রচারণামূলক কৌশলের সাথে পেরে ওঠেনি।
দিল্লির এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক ঋষি গুপ্ত বলেন, ‘বাংলাদেশে রক্ষণশীল শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে এনসিপি জেন-জি আন্দোলনের চেতনার চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার দিকে বেশি মনোনিবেশ করেছে। এর মধ্য দিয়ে ভোটারদের কাছে টানার যে সুবর্ণ সুযোগ তাদের হাতে ছিল, তা নষ্ট হয়েছে’
সময়টাও এক্ষেত্রে বড় প্রভাবক। নেপালে আন্দোলনের ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন হলেও বাংলাদেশে এই ব্যবধান ছিল প্রায় দেড় বছর। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে আন্দোলনের গতি ও জনসমর্থন স্তিমিত হয়ে পড়ে।
নির্বাচনে হারলেও বাংলাদেশের আন্দোলনকারীরা জাতীয় আলোচনায় বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। তাদের চাপের মুখে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের সংবিধান ও বিচারব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে জনগণ। নতুন বিএনপি সরকার একটি ৩১-দফা সংস্কার পরিকল্পনাও দিয়েছে।
তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের মোহভঙ্গ বা হতাশা তৈরি হয়েছে। উমামা ফাতেমা জানান, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক মেধাবী তরুণ দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়লে রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে।
নেপালের নতুন তরুণ সাংসদ পুরুষোত্তম সুপ্রভাত যাদব ঘোষণা করেছেন, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনে নিজের দলের বিরুদ্ধেও লড়বেন তারা। তার ভাষায়, আমরা রাস্তা থেকে পার্লামেন্টে এসেছি; আমাদের জায়গা বদলেছে কিন্তু লক্ষ্য নয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের তরুণরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা মনে করে, এনসিপি যদি একক শক্তিতে জনগণের পাশে থাকে, তবে ভবিষ্যতে ভালো ফলাফল সম্ভব। বর্তমান সরকার গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার না করলে আবারও রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। উমামা ফাতেমার মতে, প্রয়োজনে এবার 'জেনারেশন আলফা' নতুন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবে।