যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া আঞ্চলিক যুদ্ধে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে এক পাইলটসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবারের এ হামলায় আহত হয়েছেন আরো কয়েকজন। অন্যদিকে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় গোষ্ঠীটির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব। খবর রয়টার্স।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় সৌদি এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিমানবন্দর এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ার পর নিরাপত্তাঝুঁকিতে অনেক ফ্লাইট বাতিল করা হয়। পরে বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার কথা জানিয়েছে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্যেও দেখা গেছে, ধীরে ধীরে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। তবে অনেক এয়ারলাইনসের ফ্লাইট তখনো স্থগিত ছিল। সৌদি এয়ারলাইনস জানিয়েছে, হামলায় নিহতদের একজন তাদের কর্মী।
সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, এসব হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং নিরীহ মানুষের জীবন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। বিবৃতিতে সৌদি আরবের সরকার ও জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে অবিলম্বে এসব হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
হুথিদের সাম্প্রতিক ভূখণ্ডগত অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচলে হুমকি এবং সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে রিয়াদ। হুথি কর্মকর্তারা ও তাদের সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের দাবি, রাতভর সানায় গোষ্ঠীটির অবস্থান লক্ষ্য করে সৌদি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দেয়া সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুথিদের ব্যবহৃত তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্লাটফর্ম ধ্বংস করা হয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার জবাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে জোটটি।
এদিকে সৌদি আকাশসীমায় উড়োজাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে গতকালও হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছে হুথিরা। পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার আকাশসীমা বাদে সৌদি আরবের আকাশকে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর অভিযানের ক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে গোষ্ঠীটি। দেশটির তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করারও হুমকি দিয়েছে তারা।
সৌদি আকাশসীমায় ঝুঁকি বাড়ায় বিভিন্ন দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সতর্কতা জারি করেছে। উড়োজাহাজ চলাচলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিধি বাড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি। বিমান চলাচলের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অপস গ্রুপও সৌদি আরবের আকাশসীমার ওপর দিয়ে উড়োজাহাজ না চালানোর পরামর্শ দিয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি এয়ারলাইনস রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে।
গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের উপকূলীয় এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথিরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ইয়েমেন সংঘাতে আবারো সক্রিয় হয় সৌদি আরব। হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে দেশটির সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযানে সমর্থন দেয় রিয়াদ। সৌদি বিমান হামলা ও তীব্র লড়াইয়ের পর সোমবার বাব আল-মান্দেব উপকূলের আশপাশের কিছু এলাকা পুনর্দখল করে সরকারি বাহিনী। তবে সেখানে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ইয়েমেনে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, বাব আল-মান্দেব এলাকা হুথিমুক্ত করা হয়েছে। তবে উপকূলের কিছুটা উত্তরে মোখা এলাকায় এখনো হুথি যোদ্ধাদের উপস্থিতি রয়েছে। তায়েজ শহর ঘিরেও সংঘাত তীব্র হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় অগ্রসর হয়ে হুথিরা শহরটির সঙ্গে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও। হুথিরা লোহিত সাগর ও এর দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দিচ্ছে। একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আংশিকভাবে আটকে দেয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ আরো চাপে পড়েছে।