দ্য গার্ডিয়ান এক্সপ্লেইনার

ইবোলায় বিপর্যস্ত কঙ্গো: ভাইরাসটি এবার এত ভয়ংকর হয়ে উঠেছে কেন?

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বুন্দিবুগিও ইবোলার বিরুদ্ধে এখনো কোনো টিকা বা অনুমোদিত চিকিৎসা নেই। গত মাসে দুটি সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দুটি টিকাও প্রথমবার মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ইবোলার ইতিহাসে এবারেরটি সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রাদুর্ভাব। ২০১৪-১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার মহামারিতে ২৮ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ আক্রান্ত ও ১১ হাজার ৩২৫ জন মারা গিয়েছিলেন। সেই প্রাদুর্ভাবে ১ হাজার মৃত্যুতে পৌঁছাতেও লেগেছিল প্রায় পাঁচ মাস। কিন্তু এবার তিন মাসেরও কম সময়ে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ২ হাজার।

ভয়াবহ এক মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (ডিআরসি)। কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নেয়ায় দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকা, সশস্ত্র সংঘাত, ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে ইবোলা পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। এরই মধ্যে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২,৩২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইবোলা আসলে কী এবং কতটা মারাত্মক? আর এটি ছড়ায়ই বা কীভাবে?

ইবোলা অত্যন্ত সংক্রামক ও প্রাণঘাতী রোগ। মূলত ফলখেকো বাদুরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ভাইরাস থেকে মানুষের শরীরে এর সংক্রমণ ঘটতে পারে। আক্রান্ত মানুষ, এমনকি মৃতদেহ থেকেও বমি, রক্ত ও বীর্যের মতো শারীরিক তরলের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়ায়।

জ্বর, দুর্বলতা, পেশিতে ব্যথা ও মাথাব্যথা দিয়ে শুরু হয়ে পরে বমি, ডায়রিয়া, শরীরে ফুসকুড়ি এবং শরীরের ভেতরে-বাইরে রক্তক্ষরণ হতে পারে। রোগটির গড় মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ।

চিকিৎসা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের জুতো পরিষ্কারে ব্যস্ত এক নারী

মানুষকে আক্রান্ত করে ইবোলা ভাইরাসের এমন চারটি প্রধান ভ্যারিয়েন্ট হলো জায়ার, সুদান, বুন্দিবুগিও ও তাই ফরেস্ট। এবারের কঙ্গো প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বিরল বুন্দিবুগিও ভ্যারিয়েন্ট। এর আগে ২০০৭ ও ২০১২ সালে কেবল দুবার এই ভ্যারিয়েন্টের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল।

কেন এবারের পরিস্থিতি এত জটিল?

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বুন্দিবুগিও ইবোলার বিরুদ্ধে এখনো কোনো টিকা বা অনুমোদিত চিকিৎসা নেই। গত মাসে দুটি সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দুটি টিকাও প্রথমবার মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হচ্ছে।

কিন্তু শুধু চিকিৎসার অভাবই মূল সমস্যা নয়। ইতুরিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, নিরাপদ দাফন নিয়ে ভুল তথ্য এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলেছে। কয়েক দশকের সংঘাত ও বাইরের হস্তক্ষেপে কঙ্গোর এসব ক্ষতিগ্রস্ত আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুসংস্কার ও অবিশ্বাস গভীর।

এদিকে ভৌগলিকভাবে ইতুরি খনিজসমৃদ্ধ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতের কেন্দ্র। প্রদেশটিতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত। একারণে আরো রোগটি দক্ষিণে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত উত্তর কিভু ও দক্ষিণ কিভুতেও ছড়িয়েছে। সেখানে রুয়ান্ডার সমর্থনপুষ্ট এম২৩ গোষ্ঠীর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া। ২০২৫ সালে কঙ্গোর মানবিক সহায়তার অর্থায়ন ব্যাপক কমে যায়, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা স্থগিত করার পর। সম্প্রতি ইতুরির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীরা তিন মাস বেতন না পাওয়ায় ধর্মঘটে গেলে কেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যায়।

সংক্রমণ শনাক্ত হতে দেরি কেন?

ইবোলার সবচেয়ে পুরোনো শনাক্ত সন্দেহভাজন রোগী ছিলেন ৫৯ বছরের এক ব্যক্তি। গত ২৪ এপ্রিল তার উপসর্গ দেখা দেয় এবং তিন দিন পর তিনি মারা যান। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাবের খবর জানতে পারে ৫ মে। অথচ ততদিনে ৫০ জন মারা গেছেন।

ইবোলা আক্রান্তের মরদেহ দাফনের জন্য আসা স্বাস্থ্যকর্মীদের গ্রহণ করছেন এক গির্জার যাজক

আর এ বিলম্বই পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সংক্রমণ শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতেই। রোগ শনাক্ত ও ব্যবস্থা নিতে দেরি হলে সংস্পর্শে আসা মানুষদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সেই কাজ আরো জটিল।

কতটা বড় হতে পারে এই প্রাদুর্ভাব?

ইবোলার ইতিহাসে এবারেরটি সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রাদুর্ভাব। ২০১৪-১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার মহামারিতে ২৮ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ আক্রান্ত ও ১১ হাজার ৩২৫ জন মারা গিয়েছিলেন। সেই প্রাদুর্ভাবে ১ হাজার মৃত্যুতে পৌঁছাতেও লেগেছিল প্রায় পাঁচ মাস। কিন্তু এবার তিন মাসেরও কম সময়ে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ২ হাজার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি বিভাগের প্রধান আবদিরাহমান মাহামুদ বলেছেন, পাঁচটি সংক্রমণ এলাকায় একই সময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া গেলে তিন মাসের মধ্যে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব। তবে মাঝারি পরিস্থিতিতেও প্রাদুর্ভাবের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে ছয় মাস এবং পুরোপুরি শেষ হতে ১২ মাস পর্যন্ত লাগতে পারে।

এ মুহূর্তে তাই কঙ্গোর ইবোলা পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন তা নয়। বরং ভাইরাসের গতির চেয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঘুরে দাঁড়াতে পারছে কি না।

আরও