ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এই সংকট মোকাবেলায় সৌদি আরব চার দশক আগে নির্মিত তাদের বিশালাকার 'ইস্ট-ওয়েস্ট' পাইপলাইনটিকে পূর্ণ ক্ষমতায় ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সৌদি আরামকোর সিইও আমিন নাসের মঙ্গলবার জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই এই পাইপলাইনটি প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহের সক্ষমতায় পৌঁছে যাবে। আবকাইক তেল ক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত ৭৫০ মাইল দীর্ঘ এ পাইপলাইনটি এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রফতানির প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পাইপলাইনটি ব্যবহার করা সৌদি আরবের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধের কৌশল চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে পারে। রাইস ইউনিভার্সিটির জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জিম ক্রেইন বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি যে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, সেখান থেকে উত্তরণের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে এই পাইপলাইন। তবে এটি কেবল অপরিশোধিত তেল সরবরাহের একটি সাময়িক সমাধান মাত্র, দীর্ঘমেয়াদী সংকটের পূর্ণ সমাধান নয়।
তবে এ সমাধানের সীমাবদ্ধতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছর সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৬৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত এবং ১৪ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেল রফতানি করেছে, কিন্তু ইয়ানবু বন্দরের সক্ষমতা দিনে মাত্র ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানির। এছাড়া, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে যে কেবল অপরিশোধিত তেলেরই অভাব তা নয়, বরং ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে।
ট্রান্সভার্সাল কনসাল্টিংয়ের এলিন ওয়াল্ডের মতে, পাইপলাইনটি যদি কেবল অপরিশোধিত তেল পরিবহনেই ব্যস্ত থাকে, তবে তা প্রাকৃতিক গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি পণ্য বহনে অক্ষম হয়ে পড়বে, যা ইউরোপের মতো অঞ্চলের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
এদিকে, লোহিত সাগরের নতুন এই রুটটি নিয়েও নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এখনো চলমান এই যুদ্ধে সরাসরি জড়ায়নি, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে তারা ইরানের হাতে থাকা একটি 'ট্রাম্প কার্ড'। সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের গ্রেগ প্রিডি সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইয়ানবু দিয়ে এশিয়ায় যাওয়া সব তেলবাহী জাহাজকেই বাব আল-মান্দেব প্রণালী পাড়ি দিতে হয়, যা হুতিদের ড্রোন হামলার নাগালে রয়েছে।‘
তিনি আরো বলেন, ইরান এখন পর্যন্ত অত্যন্ত হিসেব করে সৌদি অবকাঠামোয় এমনভাবে হামলা চালাচ্ছে যাতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি না হয়, কিন্তু হুতিরা যদি এই যুদ্ধে পুরোপুরি যোগ দেয়, তবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বারবার ওঠানামা করছে, যা যুদ্ধের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিফলন। ইউরোপ এখন রাশিয়ার জ্বালানির বিকল্প হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিশোধিত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, আর এই নতুন সংকটে সেই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।