দীর্ঘ দেড় দশকের গৃহযুদ্ধ শেষে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হলেও সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা ফেরা এখনো অনিশ্চিত। একদিকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিরোধ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর বহুমুখী সামরিক তৎপরতায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আহমেদ আল-শারার অন্তর্বর্তী সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে আলেপ্পোয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং আইএসের ওপর মার্কিন বিমান হামলা সিরিয়ার ভবিষ্যৎকে আবারো অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। খবর বিবিসি ও আল জাজিরা।
সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোয় গত মঙ্গলবার থেকে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) সঙ্গে সরকারি বাহিনীর ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। স্থানীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ দিনের এ লড়াইয়ে অন্তত ২৪ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের জেরে শহরটি থেকে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মসজিদ ও গির্জায় আশ্রয় নিয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় গত শনিবার দিবাগত রাতে আলেপ্পোর শেখ মাকসুদ ও আশরাফিয়া এলাকা থেকে সব এসডিএফ যোদ্ধা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এসডিএফ কমান্ডার মাজলুম আবদি জানান, সাধারণ মানুষ ও যোদ্ধাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার জন্য তারা এ সমঝোতায় পৌঁছেছেন। বর্তমানে আলেপ্পোয় শান্তি ফিরতে শুরু করেছে এবং বাস্তুচ্যুতরা সরকারি বাসে করে নিজ এলাকায় ফিরছেন। তবে বিদ্যুৎ ও পানির সংকটের কারণে সেখানে জীবনযাপন এখনো কঠিন হয়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংঘাতের মূলে রয়েছে গত বছরের মার্চে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা। ওই চুক্তি অনুযায়ী এসডিএফ যোদ্ধাদের সিরিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখার প্রশ্নে এসডিএফ অনড় থাকায় এবং গত বছরের শেষ নাগাদ চুক্তি বাস্তবায়নের সময়সীমা পার হওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এসডিএফ বর্তমানে সিরিয়ার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলো রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে সিরিয়ায় উগ্রবাদী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) আবারো সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। গত ১৩ ডিসেম্বর পালমিরায় আইএসের হামলায় দুই মার্কিন সেনা ও একজন দোভাষী নিহত হন। এর প্রতিশোধ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ‘অপারেশন হকআই স্ট্রাইক’ শুরু হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার ২০টির বেশি যুদ্ধবিমান থেকে সিরিয়ার ৩৫টি লক্ষ্যবস্তুতে ৯০টিরও বেশি নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। জর্ডানের বিমান বাহিনীও এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ একে ‘প্রতিশোধের ঘোষণা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে সিরিয়া সিরিয়ার এ সংকটে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তুরস্ক এসডিএফকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে এবং তাদের দমনে আল-শারা সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলও সিরিয়ার অভ্যন্তরে তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে। মার্কিন সরকার বর্তমানে এক অদ্ভুত অবস্থানে রয়েছে; তারা একই সঙ্গে তুরস্ক, ইসরায়েল, এসডিএফ এবং সিরীয় সরকারের মিত্র হিসেবে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। বর্তমানে সিরিয়ায় প্রায় ১ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।