ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে চলতি মাসের শুরুতে এক সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে আটকের পর পরিস্থিতির ধোঁয়াশা কাটতে সময় লাগেনি। দ্রুত স্পষ্ট হয়ে যায়, এ অভিযানের লক্ষ্য শুধু কারাকাস নয়। ওয়াশিংটনের আসল বার্তা ছিল বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তেলক্ষেত্র উন্নয়ন থেকে শুরু করে অবকাঠামো খাতে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে আসছে বেইজিং। মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতি ছিল সেই অংশীদারত্বে বড় আঘাত, যার ফলে ভেনেজুয়েলাকে দেয়া ঋণের বিপরীতে চীনা ব্যাংকগুলোকে এখন কয়েক বিলিয়ন ডলার অনাদায়ের ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।
তবে বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ ঘটনাকে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বিস্তৃত ভূরাজনৈতিক অভিযানের সবচেয়ে জোরালো সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি মূলত লাতিন আমেরিকা থেকে চীনের প্রভাব সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ।
গত কয়েক দশকে অঞ্চলজুড়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করেছে চীন। পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহ সহজ করা ও বড় প্রকল্পে স্বল্পসুদে অর্থায়নের মাধ্যমে লাতিন আমেরিকায় নিজেদের উপস্থিতি সুদৃঢ় করেছে দেশটি। এর ফলে শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে বেইজিংয়ের।
ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ সেই দীর্ঘমেয়াদি চীনা কৌশলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং অঞ্চলজুড়ে চীনের বিনিয়োগ, অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত উপস্থিতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের প্রকাশ।
এ প্রেক্ষাপটে লাতিন আমেরিকা এখন যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যেখানে অর্থনীতি, জ্বালানি ও ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়, পশ্চিম গোলার্ধে ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের’ নিয়ন্ত্রণ যেন ‘হেমিস্ফিয়ারের বাইরের প্রতিযোগীদের’ হাতে না যায় এবং অঞ্চলজুড়ে অবকাঠামো নির্মাণে যুক্ত বিদেশী কোম্পানিগুলোকে সরিয়ে দিতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হবে।
ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসে তেল খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো সরাসরি ভাষায় বলেন, আমরা এটা না করলে চীন থাকত, রাশিয়াও থাকত। কিন্তু এখন তারা আর সেখানে থাকবে না।
ওয়াশিংটনের এ নতুন কঠোর নীতির একটি নামও তৈরি হয়েছে—‘ডনরো নীতি’। এটি ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত মনরো নীতির আধুনিক রূপ, যেখানে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় সম্মান করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ডানপন্থি বিশ্লেষকদের তৈরি এ শব্দবন্ধ এখন ট্রাম্প নিজেও ব্যবহার করছেন।
এ প্রেক্ষাপটে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন রাজধানীতে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র কি আবারো সামরিক শক্তি, কিংবা শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার মতো চাপ প্রয়োগ করে দেশগুলোকে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বদলে ওয়াশিংটনের পক্ষে টানার চেষ্টা করবে?
চীনে নিযুক্ত সাবেক চিলিয়ান রাষ্ট্রদূত হোর্হে হেইনে বলেন, চাপ যে বাড়ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশগুলো ঝুঁকির মুখে আছে, আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোতে এ চাপ কীভাবে সামলানো যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা চলছে।
চীনা নীতিনির্ধারক মহলেও এ বিষয়ে সচেতনতা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন চাপের ফলে অনেক সরকার চীনা কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে আরো সতর্ক হয়ে উঠতে পারে বা বিদ্যমান সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। পানামায় ইতিমধ্যেই এমন নজির দেখা গেছে। সেখানে দেশটির উচ্চ আদালত হংকং–সংযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের পানামা খালসংলগ্ন বন্দর পরিচালনার চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে, যেটিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সরাতে চাইছিল।
চীনের ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশল কেন্দ্রের গবেষক সুন চেংহাও বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে অবকাঠামো, সরবরাহ শৃঙ্খল ও কৌশলগত সম্পদকে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখার মার্কিন প্রবণতা লাতিন আমেরিকায় চীনের সম্পৃক্ততার রাজনৈতিক খরচ নিঃসন্দেহে বাড়াবে।
তবে একই সঙ্গে এটাও স্পষ্ট যে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীন পিছু হটতে প্রস্তুত নয়। বরং লাতিন আমেরিকাই হয়ে উঠছে একটি পরীক্ষাগার—মার্কিন আগ্রাসী নীতি কি চীনের প্রভাব ঠেকাতে পারবে, নাকি দেশগুলোকে আরো বেশি বেইজিংমুখী হতে উৎসাহিত করবে।
বর্তমানে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ৩০টিরও বেশি দেশ ও প্রায় ৬৭ কোটি মানুষের সঙ্গে চীনের বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে। ২০০০–এর দশকের শুরুতে যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, তা এখন বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালে চীন রেকর্ড ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ঘোষণা করেছে, যার পেছনে লাতিন আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য ৮ শতাংশ বৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রেখেছে।
গত দুই দশকে চীনা কোম্পানিগুলো অঞ্চলটিতে বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, সড়ক, সৌর ও বায়ুশক্তি প্রকল্প, মেট্রোরেল, খনি সবখানেই বিনিয়োগ করেছে। উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্থা এইডডাটার হিসাবে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনের সরকারি খাত থেকে দেয়া অর্থায়নের পরিমাণ ৩০২ বিলিয়ন ডলার।
পেরুতে তামা, আর্জেন্টিনা ও চিলিতে লিথিয়াম, ব্রাজিল ও চিলির বিদ্যুৎ গ্রিড, অ্যামাজনে অপটিক্যাল ফাইবার—চীনা উপস্থিতি এখন সর্বত্র। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা উদ্বেগে নিষিদ্ধ হুয়াওয়ে ও জেডটিই দক্ষিণ আমেরিকার ডিজিটাল নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ব্রাজিলে চীনের ইভি নির্মাতা বিওয়াইডি ও গ্রেট ওয়াল মোটরসের বড় বিনিয়োগও এ প্রবণতার অংশ। এসব প্রকল্প অবকাঠামো ঘাটতি কমালেও, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এগুলো ‘দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য’—অর্থাৎ প্রয়োজনে সামরিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বন্দরগুলো। ওয়াশিংটনের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে অন্তত তিন ডজনের বেশি বন্দর চীনা কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত।
তবে পেরুর দৃষ্টিকোণ থেকে চাঙ্কাই বন্দর একটি বড় অর্থনৈতিক সাফল্য। ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্প চীনে পণ্য পাঠাতে সময় ও খরচ দুটোই কমিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অঞ্চলটির দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চাপের জবাবে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নেবে। তবে তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকে একটি জিনিস স্পষ্টভাবে চাইবে—চীনের বিকল্প বাস্তব প্রস্তাব।
চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারী। কিন্তু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে মার্কিন বেসরকারি কোম্পানিগুলো চীনের রাষ্ট্রসমর্থিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে কতটা আগ্রহী, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
ভেনিজুয়েলায় এ প্রশ্ন আরো প্রকট। ট্রাম্প প্রশাসনের আহ্বান সত্ত্বেও মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এখনো দেশটিতে বড় বিনিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার বিপরীতে চীনও নীরব বার্তা পাঠাচ্ছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর বড় উপস্থিতির মধ্যেই চীন পাঠিয়েছে তাদের নৌবাহিনীর একটি হাসপাতাল জাহাজ—‘সিল্ক রোড আর্ক’। মানবিক সহায়তার মাধ্যমে নিজেকে ‘সহানুভূতিশীল শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে বেইজিং।
চীন সম্প্রতি লাতিন আমেরিকা নিয়ে নতুন নীতিপত্রও প্রকাশ করেছে, যেখানে মহাকাশ থেকে আইনশৃঙ্খলা পর্যন্ত নানা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাং শিয়াওইয়াং বলেন, স্বল্পমেয়াদে কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের দাবিতে সাড়া দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে তারা বিকল্প খুঁজবে। আর তখন চীনের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহই বাড়বে। সব মিলিয়ে, লাতিন আমেরিকা এখন যুক্তরাষ্ট্র–চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন ময়দান—যেখানে শক্তি, প্রভাব ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারিত হবে।