তীব্র হচ্ছে মানবিক সংকট

যুদ্ধের ধাক্কায় ইয়েমেনে বাড়ছে খাদ্য ও জ্বালানির খরচ

তবে গত সোমবার হুথিরা পেট্রলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ হাজার ২৫০ ইয়েমেনি রিয়াল বা ৯ দশমিক ৮০ ডলার করার ঘোষণা দেয়। হুথি পরিচালিত ইয়েমেন পেট্রলিয়াম কোম্পানি জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে ডিজেল ও পেট্রলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক হবে বলেও জানিয়েছে তারা

চলমান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের প্রভাবে ইয়েমেনে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এরই মধ্যে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পেট্রলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন চাপ তৈরি করেছে।

সানার উপকণ্ঠের একটি পেট্রল পাম্পে ২৮ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক আহমেদ ইয়াহিয়া বলেন, কাজ শুরুর আগে তিনি ট্যাক্সিতে ১০ লিটার পেট্রল ভরেন। তার ভাষায়, ‘আগে জ্বালানি ভরি, যাতে ট্যাক্সিটি আমার পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে পারে।’

চলতি সপ্তাহের শুরু পর্যন্ত ১০ লিটার পেট্রলের জন্য ইয়াহিয়াকে দিতে হতো ৪ হাজার ৭৫০ ইয়েমেনি রিয়াল, যা হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রায় ৮ ডলার ৯০ সেন্টের সমান। প্রায় চার বছর ধরে রাজধানী সানাসহ হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে এ দাম অপরিবর্তিত ছিল।

তবে গত সোমবার হুথিরা পেট্রলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ হাজার ২৫০ ইয়েমেনি রিয়াল বা ৯ দশমিক ৮০ ডলার করার ঘোষণা দেয়। হুথি পরিচালিত ইয়েমেন পেট্রলিয়াম কোম্পানি জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে ডিজেল ও পেট্রলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক হবে বলেও জানিয়েছে তারা।

ইয়াহিয়া বলেন, ‘জ্বালানি দামের ঘোষণা শুনে আমি হতবাক ও হতাশ। আমরা কোনোমতে টিকে আছি। এই মূল্যবৃদ্ধি টিকে থাকাটাকে আরো কঠিন করে তুলবে।’

ইয়েমেনে এরই মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

তিন সন্তানের বাবা ইয়াহিয়া পাঁচ বছর ধরে ট্যাক্সি চালান। তার পরিবার প্রতি মাসে আটা, চাল ও রান্নার তেলের মতো খাবারের পেছনে প্রায় ৭৫ হাজার ইয়েমেনি রিয়াল বা ১৪০ ডলার খরচ করে। জ্বালানির দাম বাড়ায় একই পরিমাণ খাবারের জন্য মাসে অন্তত ৮৫ হাজার রিয়াল বা ১৫৯ ডলার প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি।

ইয়েমেনে কয়েক মাস ধরে লড়াই ফের তীব্র হওয়ায় পণ্যের দাম বাড়ছে। ট্রাকচালকরা যুদ্ধের কাছাকাছি সড়ক এড়িয়ে চলায় দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে বেশি সময় লাগছে। সানার দোকানি সালেহ আবদুল্লাহ বলেন, দক্ষিণ থেকে উত্তরে বা উল্টো পথে পণ্যবাহী একটি ট্রাকের গন্তব্যে পৌঁছাতে এখন এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগছে। অথচ নতুন করে সংঘাত শুরুর আগে একই পথ পাড়ি দিতে তিন দিন বা তার কম সময় লাগত।

বাড়তি পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানির মূল্য শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই চাপছে। আবদুল্লাহ বলেন, ‘আটা, শিশুদের দুধ, ফল, সবজি—যাই হোক না কেন, দাম বাড়ার এই চাপ পরিবারগুলোকে অনুভব করতে হবে।’

সানা গভর্নরেটের নেহম কাস্টমস চেকপোস্টের কর্মী ইব্রাহিম আবদু জানান, গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীতে আসা ট্রাকের সংখ্যা কমেছে। তার ভাষায়, ‘লড়াই অনেক সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য ও চালকদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাইছেন না।’

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অর্ধেকের বেশি মানুষ জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে। সংঘাতের কারণে ব্যাপক খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, রোগের প্রাদুর্ভাব, পরিবারের সদস্যদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং নিরাপদ পানির সীমিত প্রাপ্যতা তৈরি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

হোদেইদায় সাবেক মানবিক সহায়তাকর্মী আহমেদ মোহাম্মদ জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ‘ক্ষুধা বাড়ানোর গুণক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যদি পরিবারের তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খান, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে হয়তো তাকে দুই বেলার খাবারেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। এতে পরিবারগুলোর ক্ষুধা আরো বাড়বে।

অর্থনৈতিক গবেষক ও তাইজ সেন্টার ফর ইয়েমেনি-গালফ স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ওয়াফিক সালেহ বলেন, হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জ্বালানির দাম ১০ শতাংশ বাড়ার প্রভাব শুধু পেট্রল পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর ফলে মূল্যস্ফীতির বড় ঢেউ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, কৃষি, পরিবহন ও সেবা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেচের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। পরিবহন ব্যয় বাড়ায় যাত্রীভাড়া ও খাদ্যপণ্যের দামও বাড়বে। ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল পানি ও বিদ্যুৎ সেবার খরচও বাড়তে পারে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোও চাপে পড়বে। সালেহ বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত অল্প মুনাফায় পরিচালিত হয়। ফলে তাদের হয় ব্যবসা বন্ধ করতে হবে, নয়তো বাড়তি ব্যয় পণ্যের চূড়ান্ত দামের সঙ্গে যোগ করতে হবে।

আল জাজিরা অবলম্বনে

আরও