২৫০ দিন পর থাইল্যান্ডে নোঙর করল মার্কিন রণতরি আব্রাহাম লিংকন

থাই পর্যটন নগরী পাতায়ার সঙ্গে মার্কিন সেনাদের সম্পর্ক বেশ পুরনো। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য (আরঅ্যান্ডআর) কয়েক লাখ মার্কিন সেনা পাতায়ায় গিয়েছিলেন। তাদের সরব উপস্থিতিতে তৎকালীন শান্ত মাছ ধরার গ্রামটি ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিনোদননগরীতে পরিণত হয়।

টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে থাকার পর অবশেষে থাইল্যান্ডে নোঙর করেছে পারমাণবিক শক্তিচালিত মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। প্রায় ৫ হাজার নাবিক নিয়ে জাহাজটি থাইল্যান্ডের পর্যটন শহর পাতায়ার কাছে অবস্থান করছে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর নাবিকদের জন্য এটি বিশ্রামের সুযোগ তৈরি করেছে। খবর বিবিসি।

গত নভেম্বরে সান দিয়েগো ছেড়েছিল ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এরপর প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে ছয় মাসের অভিযান ছিল জাহাজটির। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলে জাহাজটির গন্তব্য পরিবর্তন করে উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়।

সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য জাহাজটির নাবিকদের খাবারের সংকট, নষ্ট টয়লেট ও মানসিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করেছে, নাবিকদের কর্মপরিবেশ কঠিন ছিল। তবে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।

পাতায়ায় রণতরিটি নোঙর করার বিষয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে নৌবাহিনী। অপারেশনাল নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, থাই পর্যটন নগরী পাতায়ার সঙ্গে মার্কিন সেনাদের সম্পর্ক বেশ পুরনো। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য (আরঅ্যান্ডআর) কয়েক লাখ মার্কিন সেনা পাতায়ায় গিয়েছিলেন। তাদের সরব উপস্থিতিতে তৎকালীন শান্ত মাছ ধরার গ্রামটি ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিনোদননগরীতে পরিণত হয়।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিভিত্তিক মিত্র। ফলে থাইল্যান্ডে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজের সফর নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে ১৯৭৫ সালে সাইগনের পতনের পর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি পাতায়ায় এত বিপুলসংখ্যক মার্কিন সামরিক সদস্যের আগমন সম্ভবত এবারই সবচেয়ে বড়।

মার্কিন নাবিকদের ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা

এদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পর্যটন ও ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ায় পাতায়ার ব্যবসাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সমুদ্রে কাটানো নয় মাসের বেতন খরচ না করা হাজারো মার্কিন নাবিকের আগমন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

ওয়াকিং স্ট্রিটের কাছে রত্নের দোকানের ব্যবসায়ী আনন সাইতিয়ার বলেন, মার্কিন নাবিকদের এ সফর স্থানীয় ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় আশা হতে পারে। মার্কিন নাবিক ও মেরিনদের স্বাগত জানিয়ে তার দোকানে বিশেষ ছাড়ের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের হারানোর কিছু নেই। আমরা শুধু আশা করছি, তারা এখানে কিছু অর্থ খরচ করবেন।

থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মার্কিন সেনাদের কয়েকটি এলাকায় যাওয়ার অনুমতি থাকবে না। এর মধ্যে রয়েছে প্রধান সৈকতের দিকে যাওয়া সোই ৬, বিপুলসংখ্যক যৌন বিনোদনকেন্দ্র রয়েছে।

থাই পুলিশ মার্কিন সেনাদের সতর্ক করে দিয়েছে, দেশটিতে পতিতাবৃত্তি আইনত নিষিদ্ধ। তবে পাতায়ায় আনুমানিক ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার যৌনকর্মী রয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের অনেকে সোই ৬ এলাকায় বিভিন্ন বারের বাইরে অবস্থান করেন।

পাতায়ার বহু গাঁজার দোকানও মার্কিন নাবিকদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্যারাগ্লাইডিং ও জেট-স্কির মতো সমুদ্রভিত্তিক খেলাধুলায় অংশ নিতেও তাদের নিষেধ করা হয়েছে।

পাতায়ার মেয়র পোরামাসে এনগামপিচেস বিবিসিকে বলেন, এটি তাদের সিদ্ধান্ত। মার্কিন সামরিক বাহিনী আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে।

নিরাপত্তায় শত শত পুলিশ

মার্কিন রণতরীটি পাতায়ার বন্দরে পৌঁছনোর পর শহরে যাতায়াতের জন্য শাটল বাসের ব্যবস্থা করেছে। রণতরিটি থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত এসব বাস চলবে। নাবিকদের জন্য শহরের দুটি হোটেলও নির্ধারণ করা হয়েছে।

এরই মধ্যে শহরের বিনোদন এলাকাগুলোর নিরাপত্তায় শত শত পুলিশ মোতায়েন করেছে থাই কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে মার্কিন অতিথিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম না নেয়ার জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে।

মেয়র পোরামাসে বলেন, ৫০-৬০ বছর আগে মার্কিন সামরিক সদস্যদের সফরই পাতায়াকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলেছিল এবং এটিকে পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছিল।

দুই দেশই আশা করছে, আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দীর্ঘ যাত্রা শুরুর সময় রণতরিটির নাবিকরা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে সতেজ হয়ে ফিরতে পারবেন।

আরও