ব্ল্যাক উইডো

যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের লোভে রাশিয়ায় প্রতারণামূলক বিয়ের অভিযোগ

গত বছর বহুল আলোচিত এক ঘটনায় একটি সামরিক হাসপাতালের এক নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। বলা হচ্ছে, চিকিৎসাধীন পাঁচ সেনাকে বিয়ে করেছিলেন তিনি এবং তাদের মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণের অর্থ নেয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগের পর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়

ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত রুশ সেনাদের পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা দিতে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেয় রুশ সরকার। কিন্তু সেই ক্ষতিপূরণকে ঘিরে নতুন এক ধরনের প্রতারণার অভিযোগ সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, যুদ্ধের আগে বা গুরুতর আহত অবস্থায় থাকা সেনাদের দ্রুত বিয়ে করে পরে তাদের মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণের অর্থ দাবি করছেন কিছু নারী। রুশ কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম এ ধরনের নারীদের ‘ব্ল্যাক উইডো’ নামে অভিহিত করছে।

মারিয়া নামে সেন্ট পিটার্সবার্গের এক নারী জানতেন না যে তার ৫৯ বছর বয়সী বাবা ইউরি গোপনে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর খবর জানাতে গিয়ে রুশ সেনাবাহিনী আরো জানায়, ইউক্রেনে পাঠানোর মাত্র দুই দিন আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন। নতুন স্ত্রীই আইনগতভাবে তার নিকটাত্মীয় হওয়ায় ক্ষতিপূরণের দাবিদার হন।

৩৭ বছর বয়সী মারিয়ার দাবি, তিনি ওই নারীর নামও আগে কখনো শোনেননি। তাই শুরু থেকেই তার মনে হয়েছে, এটি পরিকল্পিত প্রতারণা হতে পারে। বাবার মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, তার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেও প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই বলে জানান তিনি।

রাশিয়ায় যুদ্ধে নিহত কোনো সেনার আইনগত নিকটাত্মীয়কে অন্তত ৫০ লাখ রুবল বা প্রায় ৬৪ হাজার ডলার এককালীন ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সেনাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়া। কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ, এই অর্থই কিছু প্রতারকের জন্য বড় প্রলোভন হয়ে উঠেছে।

রাশিয়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এমন একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। কোথাও অভিযোগ উঠেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে সেনাদের বিয়েতে প্রলুব্ধ করা হয়েছে। আবার কোথাও গুরুতর আহত সেনাদের মৃত্যুশয্যায় বিয়ে করার ঘটনাও সামনে এসেছে।

গত বছর বহুল আলোচিত এক ঘটনায় একটি সামরিক হাসপাতালের এক নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। বলা হচ্ছে, চিকিৎসাধীন পাঁচ সেনাকে বিয়ে করেছিলেন তিনি এবং তাদের মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণের অর্থ নেয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগের পর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ায় অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট, হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘ব্ল্যাক উইডো’ অভিযোগ জনমনে আরো ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

রুশ পার্লামেন্টের প্রভাবশালী সদস্য লিওনিদ স্লুতস্কি বলেছেন, যুদ্ধে অংশ নেয়া সেনাদের পরিবারকে ‘ব্ল্যাক উইডো’, আর্থিক প্রতারক ও অন্যান্য অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। তার ভাষায়, এ ধরনের অপরাধ উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার সরকার নতুন সেনাদের দ্রুত বিয়ে করতে উৎসাহ দেয়। বিয়ের জন্য প্রচলিত ওয়েটিং টাইমও অনেক ক্ষেত্রে শিথিল করা হয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে গণবিয়ের আয়োজন করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে পারিবারিক সমর্থন নিশ্চিত করা, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রচারিত ‘পারিবারিক মূল্যবোধ’ নীতির অংশ ছিল।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনুষ্ঠানে এ ক্ষতিপূরণকে ঘিরে বিতর্কিত মন্তব্যও দেখা গেছে। গত বছর সাইবেরিয়ার টমস্ক শহরের এক ভিডিও পডকাস্টে এক রিয়েল এস্টেট এজেন্ট রসিকতার ছলে বলেন, ‘যুদ্ধে থাকা একজনকে বিয়ে করো, তিনি নিহত হলে ৮০ লাখ রুবল পাবে, সেই টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে ফেলো।’ ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি ও অনুষ্ঠানের উপস্থাপককে আদালত কমিউনিটি সার্ভিসের দণ্ড দেন এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হয়।

আরেকটি বহুল আলোচিত ঘটনায় রিয়াজানের এক সেনার মা অভিযোগ করেন, ছুটিতে এসে তার ছেলে অনলাইনে পরিচিত এক নারীকে বিয়ে করেন। পরে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হলে সেনাটি বিচ্ছেদের উদ্যোগ নেন। কিন্তু বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার আগেই তিনি যুদ্ধে নিহত হন। ফলে আইনগতভাবে স্ত্রীই ক্ষতিপূরণের দাবিদার হন। যদিও পরে আদালত তার সেই অধিকার বাতিল করে।

আরো উদ্বেগজনক অভিযোগও সামনে এসেছে। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের প্রিমোরস্কি ক্রাই অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা এতিম বা ঘনিষ্ঠ স্বজনহীন পুরুষদের খুঁজে এনে বিয়ের ব্যবস্থা করতেন। পরে ওই সেনাদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানো হতো, যাতে নিহত হলে ক্ষতিপূরণের অর্থ ভাগাভাগি করা যায়। তবে এ মামলার তদন্তের পর আর কোনো সরকারি অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

মারিয়ার অভিযোগ, তার বাবার মৃত্যুর পর তার অ্যাপার্টমেন্টও বিক্রি হয়ে গেছে এবং তিনি মনে করেন, এটিও প্রতারণার অংশ হতে পারে। এখন তার বাবার স্মৃতিচিহ্ন বলতে শুধু পুরোনো কিছু চাবি, যেগুলোও আর কোনো দরজা খোলে না।

তবে সব দ্রুত বিয়েই যে প্রতারণামূলক, তা নয়। কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্ত নারীরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং আদালতও সব অভিযোগকে সত্য বলে রায় দেয়নি। ফলে ‘ব্ল্যাক উইডো’ নামে আলোচিত ঘটনাগুলোর অনেকই এখনো অভিযোগ বা তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।

সিএনএন অবলম্বনে

আরও