জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে উদ্গীরিত লাভা ঐতিহাসিকভাবে ভয়ংকর, অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত। লাভার উদ্গীরনে ভবন ও জনপদ ধ্বংসের নজিরও কম নেই। কিন্তু যদি এই লাভার শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে নতুন শহর গড়ে তোলা যায়? আইসল্যান্ডের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘এস অ্যাপ আর্কিটেকচার’ ঠিক এমনই এক সাহসী ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। এ বছরের ভেনিস আর্কিটেকচার বাইনালেতে এ পরিকল্পনা উপস্থাপনও করেছে তারা।
স্বাভাবিকভাবে লাভা ঠান্ডা হয়ে গিয়ে ব্যাসল্টের মতো আগ্নেয় শিলায় পরিণত হয়। কিন্তু ‘লাভা ফর্মিং’ নামে এই প্রকল্পে চিন্তা করা হয়েছে—লাভাকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ঠান্ডা করে কীভাবে তা ভবনের দেয়াল, খুঁটি বা অন্যান্য কাঠামো তৈরি করতে ব্যবহৃত হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি একটি কল্পচিত্র নির্মাণ করেছে যেখানে ২১৫০ সালের ভবিষ্যতের এক কল্পিত রূপ দেখানো হয়েছে। তাদের এ কল্পচিত্রে লাভা ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে নতুন নগর।
প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা আর্নহিলদুর প্যালমাদোত্তির ও তার ছেলে আর্নার স্কারফেদিনসন দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, যে শক্তিকে আমরা এখন শুধু বিপদ হিসেবে দেখি, কীভাবে সেটিকে টেকসই ভবন নির্মাণে নবায়নযোগ্য সম্পদে রূপান্তর করা যায়।
আইসল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় আগ্নেয়গিরির অঞ্চল, যেখানে গড়ে প্রতি পাঁচ বছরে একবার অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। ২০১৪ সালের হলুহ্রাউনের অগ্ন্যুৎপাত চলাকালীন প্যালমাদোত্তির উপলব্ধি করেন, ভূপৃষ্ঠ থেকে এত বিশাল পরিমাণ লাভা বেরিয়ে আসছে যে, এটা দিয়ে এক সপ্তাহেই একটা শহর বানিয়ে ফেলা সম্ভব।
এই ভাবনা থেকেই লাভা ফমিং প্রকল্পটি শুরু হয়। প্যালমাদোত্তির বলেন, লাভাও কংক্রিটের মতো বৈশিষ্ট্যযুক্ত হতে পারে। তবে এটি নির্ভর করে কীভাবে ঠান্ডা করা হবে তার ওপর। দ্রুত ঠান্ডা হলে এটি কাচের মতো শক্ত, ধীরে ঠান্ডা হলে এটি স্ফটিক হয়ে শক্ত খুঁটি তৈরিতে কাজে লাগে। আবার হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে তার মধ্যে বাতাস ঢুকলে এটি ফেনার মতো হালকা ও উত্তাপ নিরোধক পদার্থে পরিণত হয়। তিনি বলেন, অগ্ন্যুৎপাত হলে লাভা থেকে যে কার্বন নির্গত হয়, তা যেভাবেই হোক পরিবেশে ছড়াবে—তাই বরং সেটিকে কাজে লাগিয়ে কংক্রিটের অতিরিক্ত কার্বন নির্গমন এড়ানোই ভালো।
এস অ্যাপ আর্কিটেকচার- লাভা ব্যবহার করে ভবন নির্মাণের তিনটি পদ্ধতির চিন্তা করেছে।
প্রথম পদ্ধতিতে, সক্রিয় আগ্নেয়গিরির পাদদেশে পরিকল্পিতভাবে খাল বানিয়ে লাভা সেখানে প্রবাহিত করা যায়, যাতে এটি ঠান্ডা হয়ে শহরের ভিত্তি বা দেয়াল হয়ে যায়। এই খালগুলোকে এমনভাবে তৈরি করা যায় যাতে তা লাভাকে গাইড করে ফ্যাক্টরিতে নেয়া যায়, যেখানে তা ইট বা অন্যান্য নির্মাণ উপাদানে রূপান্তর করা সম্ভব। এর ফলে পার্শ্ববর্তী জনপদও লাভার ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে পারে।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে কল্পনা করা হয়েছে ভবিষ্যতের ৩ডি প্রিন্টিং রোবট, যারা লাভার ওপর চলাফেরা করে সরাসরি ভবনের কাঠামো তৈরি করতে পারবে। যদিও এরকম রোবট এখনো বাস্তবে তৈরি হয়নি।
তৃতীয় কৌশলে চিন্তা করা হয়েছে—ভূপৃষ্ঠের নিচের ম্যাগমাকে বিশেষ চেম্বারে প্রবাহিত করে ঠান্ডা করে আগে থেকে তৈরি স্থাপত্য উপাদান বানানো। এই প্রক্রিয়া আইসল্যান্ডের ভূ-তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতির মতোই হতে পারে, যদিও এটি ভূতাত্ত্বিকভাবে কতটা নিরাপদ তা এখনো জানা নেই।
প্রকল্পটি এখনো গবেষণা ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এটি বাস্তবায়নের জন্য আরো উন্নয়ন প্রয়োজন। তবে ২০২২ সালে এ প্রকল্প শুরুর পর থেকে বিজ্ঞানীরা এতে যুক্ত হচ্ছেন। লাভা প্রবাহের ৩ডি মডেল, লাভা পুনরায় গলিয়ে ঠান্ডা করে নানা উপাদান বানানোর পরীক্ষা চালছে।
উত্তপ্ত লাভা ঠাণ্ডা হয়ে বাসাল্টের মতো আগ্নেয় শিলায় পরিণত হয়। ছবি- সিএনএন
এই ধারণাটি অগ্ন্যুৎপাতের সময় ও স্থানের ওপর নির্ভরশীল হলেও প্যালমাদোত্তির ধারণা— এটি শুধু আইসল্যান্ড নয়, হাওয়াই বা ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের মতো লাভাপ্রবণ অঞ্চলেও বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে।
ভলকানিক শিলা নতুন নয়—মানবসভ্যতা বহুদিন ধরে এটি দিয়ে দেয়াল বা কাঠামো তৈরি করছে। ব্যাসল্ট দিয়ে মধ্যযুগের দুর্গ, মন্দির ও আধুনিক ভবন নির্মাণ হয়েছে বিভিন্ন দেশে। এটি শক্ত, টেকসই, উত্তাপ নিরোধী ও আকর্ষণীয় বলে স্থপতিরা পছন্দ করেন।
কিন্তু এস অ্যাপ আর্কিটেকচার লাভাকে গলিত অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ করে একটিমাত্র উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে চায়—যাতে একই কাঠামোর ভেতরেই কঠিন ব্লক, ফেনার মতো হালকা অংশ বা কাচের মতো স্বচ্ছ প্যানেল তৈরি সম্ভব হয়। এমন কিছু আগে কখনো হয়নি। প্রকৃতির কাছ থেকেই তারা অনুপ্রাণিত—ক্যানারি দ্বীপের ল্যানজারোটে দ্বীপে লাভার বুদবুদের কারণে তৈরি হওয়া গুহায় বিখ্যাত স্থপতি সেজার মানরিক নিজের বাসা তৈরি করেছিলেন।
সিএনএন অবলম্বনে