যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ে তেহরানের প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার পর এ মন্তব্য করলেন তিনি। খবর বিবিসি।
এর আগে শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। তার দাবি, ইরান খুব শোচনীয়ভাবে হারছে বলেই সাত দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার চুক্তি করতে চাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আমি তাদের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করছি। তার দাবি, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ইতোমধ্যে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’রয়েছে। তার ভাষ্য, বিপুল পরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে যাওয়ার কারণে বৈশ্বিক তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং ভোক্তাদের জ্বালানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এরপর টেলিগ্রামে দেয়া এক বার্তায় ট্রাম্পের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি স্বীকার করেন আরাগচি। তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত জবাবের জন্য ইরান অপেক্ষা করবে। ট্রাম্প অতীতে অনেক ইতিবাচক বক্তব্য দেয়ার পাশাপাশি পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও দিয়েছেন, যা প্রায়ই শুনতে হয়। এ বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবস্থান জানার পর সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে তেহরান।
তিনি আরো বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার জন্য ইরানের যে শর্তগুলো রয়েছে, সেগুলো গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং সংঘাত বন্ধের বিষয়টি আলোচনায় তোলে ইরান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়া ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসকে বলেন, আলোচনাকে সফল করতে হলে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস কাটিয়ে উঠতে হবে। অচলাবস্থা কাটাতে জুনের সমঝোতা স্মারকটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে ইরান আলোচনায় প্রস্তুত। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে হবে যে তারা ইরানের সরকার উৎখাত করতে চায় না।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় বোমা হামলা শুরু করার মাধ্যমে ওই সমঝোতা ছিঁড়ে ফেলেছে। তার প্রশ্ন, লিখিত সমঝোতার বিষয়গুলোই যদি মানা না হয়, তাহলে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব?
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির স্বাস্থ্য নিয়েও তাকে প্রশ্ন করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তার বাবা নিহত হওয়ার সময় মোজতবা আহত হন এবং এরপর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার পা ও মুখে গুরুতর আঘাতের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, তিনি সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে দুবার সাক্ষাৎ করেছেন। তার দাবি, মোজতবার বর্তমানে নির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা জটিলতা নেই এবং তিনি সাত ঘণ্টা ধরে আলোচনা করার মতো সুস্থ ছিলেন।
সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান ওমানের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা ওমান সংকট সমাধানে সব পক্ষকে উন্মুক্ত সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর বিন হামাদ বিন হামুদ আলবুসাইদি বলেন, হরমুজে নৌ-চলাচল নিরাপদ রাখতে ওমানের প্রচেষ্টায় সব পক্ষের সহযোগিতা করা উচিত।
অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানকে সমর্থন করেছেন ন্যাটোতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ম্যাথিউ হুইটেকার। শনিবার ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ইরান অসম্পূর্ণ পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি ভালো দেখানোর জন্য অবাস্তব চুক্তি প্রস্তাব করেছে। তার ভাষ্য, ট্রাম্পের তা প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রয়েছে।
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দাবি
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট শনিবার দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের ওপর চাপ বাড়ছে। এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, তুরস্ক, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বন্ধ করেছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের কিছু ব্যাংক ইরানের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে ট্রাম্প প্রশাসন এ অবরোধকে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে অভিহিত করেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানের হামলা বন্ধে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগই এর লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে কিছু অর্থনীতিবিদ প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এর কার্যকারিতা অনেকাংশে ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। এসব দেশের মধ্যে চীন অন্যতম; দেশটি ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা এবং আগের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে গেছে।