ইরান নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আদানির ২৭ কোটি ডলারে সমঝোতা

যুক্তরাষ্ট্রে ঘুস ও প্রতারণার অভিযোগে ২০২৪ সালে অভিযুক্ত হয় ভারতের আদানি গ্রুপ। এবার প্রতিষ্ঠানটি ইরানবিষয়ক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে বড় অংকের সমঝোতায় গেছে।

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানি জ্বালানি বাণিজ্যসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের ৩২টি সম্ভাব্য ঘটনার দায় এড়াতে আদানি এন্টারপ্রাইজেস ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সমঝোতায় রাজি হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সরবরাহকারীর মাধ্যমে আমদানি করা এলপিজির প্রকৃত উৎস গোপন করে ইরান থেকে জ্বালানি সংগ্রহের অভিযোগ তদন্ত করছিল যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি)। তদন্ত শেষে সমঝোতার এ ঘোষণা আসে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ স্বীকার করেনি।

নতুন এ সমঝোতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাজারে আবারো আলোচনায় এসেছে আদানি গ্রুপ। আর সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তিতে কোনো প্রভাব পড়তে পারে কিনা, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বর্তমানে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানি পাওয়ার। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ২৫ বছর মেয়াদী বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি রয়েছে। এর আগেও কয়লার দাম নিয়ে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে আর্থিক বিতর্ক রয়েছে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জাতীয় চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি জানিয়েছিল, ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির উৎস রয়েছে। এ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে চুক্তিটি বাতিলের জন্য বিষয়টিকে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করে কমিটি।

কমিটির সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান সেই সময় জানান, শর্তের মারপ্যাঁচে ২০২৫ সালে আদানির বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট, যা অন্য উৎসের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশকে ৪০-৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে এবং ২৫ বছরের মেয়াদে এ লোকসানের মোট পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে।

তবে জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বাংলাদেশের বিদ্যমান চুক্তির ওপর তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা কম। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া বিদ্যুৎ চুক্তিটি নির্দিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে সম্পাদন হয়েছে।

পিডিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে সেটা নির্দিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে। এ চুক্তির ভেতরে যদি কোনো অনিয়ম, তথ্য গোপন বা প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যায়, তখন সরকার চুক্তি বাতিলের বিষয় বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু অন্য দেশে তারা কী করেছে, শুধু সেই কারণে বিদ্যমান চুক্তি বাতিল করা কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘বড় বহুজাতিক গ্রুপগুলো সাধারণত বিভিন্ন দেশে আলাদা কোম্পানি বা সাবসিডিয়ারির মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে। আদানি গ্রুপও বাংলাদেশের প্রকল্পের জন্য আলাদা কোম্পানি ব্যবহার করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো তদন্ত বা সমঝোতা হলেও সেটিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চুক্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা সহজ নয়।’

তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে করপোরেট সুনাম বা ‘রেপুটেশনাল রিস্ক’ ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। তাদের ভাষ্য, আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগ ওঠার পর আফ্রিকার কয়েকটি দেশে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত বা বাতিল হয়েছিল। যদিও যেসব দেশে চুক্তি আগে থেকেই কার্যকর ছিল, সেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিনিয়োগ বিশ্লেষক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অভিযোগ নতুন বিনিয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় চুক্তি সাধারণত সহজে বাতিল হয় না। কারণ এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ, আর্থিক দায় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির বিষয় জড়িত।’

বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য মূলত একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তির ক্ষেত্রে অংশীদার প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স, আইনি ঝুঁকি এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স আরো গভীরভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে আরো কঠোর বৈশ্বিক আর্থিক ও বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার মধ্যে কাজ করতে হবে। ফলে জ্বালানি আমদানিতে উৎস যাচাই, ডলারভিত্তিক লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং স্যাংশন কমপ্লায়েন্স ভবিষ্যতে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আরও