আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ: অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জোট কি টিকবে?

ন্যাটোর ভিত্তি হলো সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা। জোটের চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এ অনুচ্ছেদ কার্যকর করতে হলে সব সদস্যের সর্বসম্মত সম্মতি প্রয়োজন।

গ্রিনল্যান্ড দখল বা প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়ে আবারো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের ‘প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঠেকাতে’ গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কিন্তু এ হুমকি ন্যাটোর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সংকট তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

ডেনমার্কের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। সেখানে অবস্থিত পিটুফিক স্পেস বেস ডেনিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালনা করে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক উভয় দেশই ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তাহলে তা কার্যত এক ন্যাটো সদস্যের বিরুদ্ধে আরেক সদস্যের সামরিক আগ্রাসনের শামিল হবে।

ইউরোপ ও কানাডার নেতারা এরইমধ্যে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই হুমকি বাস্তবায়ন করে, সে ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

ন্যাটোর মূল নীতি ও জটিলতা

ন্যাটোর ভিত্তি হলো সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা। জোটের চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এ অনুচ্ছেদ কার্যকর করতে হলে সব সদস্যের সর্বসম্মত সম্মতি প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই বড় সংকট। যদি এক ন্যাটো সদস্য অন্য সদস্যকে আক্রমণ করে, তাহলে ন্যাটো নিজেই সিদ্ধান্তহীনতায় পড়বে। কারণ জোট নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে না।

ন্যাটোর ইতিহাসে অনুচ্ছেদ ৫ মাত্র একবার কার্যকর হয়েছিল, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর।

ন্যাটো সদস্যদের মধ্যকার অতীত সংঘাত

তবে ইতিহাসে ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে সরাসরি বা পরোক্ষ সংঘাতের নজির রয়েছে—

কড যুদ্ধ (১৯৫৮-১৯৭৬): যুক্তরাজ্য ও আইসল্যান্ডের মধ্যে উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের মাছ ধরার অধিকার নিয়ে নৌ-সংঘর্ষ ঘটে। আইসল্যান্ড তাদের সমুদ্রসীমা বারবার বাড়ানোর চেষ্টা করলে ব্রিটিশ জেলেরা তাতে বাধা দেয়। সেসময় আইসল্যান্ড হুমকি দিয়েছিল যে ব্রিটেন যদি পিছু না হটে, তবে তারা ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ কেফ্লাভিক বিমান ঘাঁটি বন্ধ করে দেবে। সোভিয়েত ইউনিয়নকে নজরে রাখার জন্য এই ঘাঁটিটি ছিল অপরিহার্য। ফলে শেষ পর্যন্ত ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপে যুক্তরাজ্য পিছু হটে।

সাইপ্রাস সংকট (১৯৭৪): এটি ছিল ন্যাটোর ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়, যখন দুই সদস্য দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তির যুদ্ধে নামার উপক্রম হয়েছিল। গ্রিস-সমর্থিত অভ্যুত্থানের পর তুরস্ক সাইপ্রাসে সামরিক অভিযান চালায়। এর ফলে ন্যাটোর দুই মিত্র দেশ গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়। এ উত্তেজনার প্রতিবাদে গ্রিস ন্যাটোর সামরিক কমান্ড থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয় । দুই ন্যাটো সদস্যের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হলেও জোট তা ঠেকাতে সক্ষম হয়।

টারবট যুদ্ধ (১৯৯৫): কানাডা ও স্পেনের মধ্যে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে নৌ-উত্তেজনা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে কানাডার কোস্টগার্ড স্পেনের একটি মাছ ধরার ট্রলার লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং ট্রলারটি আটক করে। এ ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্পেনের পক্ষে দাঁড়ালেও ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ড কানাডাকে সমর্থন দেয়। শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় সমাধান আসে।

বড় যুদ্ধ ইস্যুতে বিভক্ত ন্যাটো

ন্যাটো বহুবার বড় যুদ্ধ ইস্যুতে অভ্যন্তরীণ বিভক্তির মুখে পড়েছে—

সুয়েজ সংকট (১৯৫৬): এটি ছিল ন্যাটোর ইতিহাসের প্রথম বড় ধাক্কা। মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে ইসরায়েলের সঙ্গ মিলে মিশরে আক্রমণ চালায়। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার ক্ষুব্ধ হন, কারণ তিনি মনে করেছিলেন এ যুদ্ধ আরব দেশগুলোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঠেলে দেবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অর্থনৈতিক চাপের হুমকি দিয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৬০-১৯৭০): ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ন্যাটো মিত্রদের কাছ থেকে সরাসরি সৈন্য চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ফ্রান্স ও ব্রিটেন একে ভুল যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করে দূরত্ব বজায় রাখে। ক্ষোভে ফ্রান্স ১৯৬৬ সালে ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক কমান্ড থেকে বেরিয়ে যায়। এর ফলে ন্যাটোর সদর দপ্তর ফ্রান্স থেকে বেলজিয়ামে সরিয়ে নিতে হয়।

ইরাক যুদ্ধ (২০০৩): সাদ্দাম হোসেনের কাছে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ আছে যুক্তরাষ্ট্রের এ দাবির ভিত্তিতে যখন ইরাক আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়, তখন ন্যাটো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন যুদ্ধের পক্ষে থাকলেও ফ্রান্স, জার্মানি ও বেলজিয়াম এর তীব্র বিরোধিতা করে। এ বিভাজন এতটাই গভীর ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নেতা একে ‘পুরাতন ইউরোপ’ বনাম ‘নতুন ইউরোপ’ হিসেবে অভিহিত করেন। শেষ পর্যন্ত এটি ন্যাটোর যুদ্ধ না হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি 'কোয়ালিশন' যুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পায়।

লিবিয়া অভিযান (২০১১): গাদ্দাফি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের বাঁচাতে জাতিসংঘ যখন 'নো-ফ্লাই জোন' ঘোষণার অনুমতি দেয়, তখন ন্যাটোতে আবার সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়।

ন্যাটোর অস্তিত্বের পরীক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ন্যাটোর ঐক্যের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই শক্তি প্রয়োগের পথে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে ন্যাটো কি কেবল বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ, নাকি অভ্যন্তরীণ আগ্রাসনের ক্ষেত্রেও তার কোনো কার্যকর কাঠামো আছে?

আরও