সোশ্যাল মিডিয়ায় উস্কানি

অভিবাসন সংকট যেভাবে রূপ নিল রাজনৈতিক ঝড়ে

মরক্কোয় ফেরা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বন্ধুদের বার্তা দেখে তারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, সীমান্ত অতিক্রম করা সম্ভব। তবে সেউতায় পৌঁছানোর পর স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার কোনো পথ না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়েন।

কয়েকদিন আগের ঘটনা। মরক্কো থেকে সাঁতরে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করে হাজার হাজার অভিবাসী। তবে তাদের অভিবাসনের সে স্বপ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ক্ষুধা, চরম ক্লান্তি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বৈরী আচরণের মুখে তাদের প্রায় সবাই ফিরে গেছেন মরক্কোতে। স্প্যানিশ সেনা ও পুলিশের পাহারায় তাদের সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে অভূতপূর্ব এ মানবিক সংকটে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬৭ জন অভিবাসী। সমুদ্রে ভেসে থাকা টায়ারের টিউব ও ফ্লিপারের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় তাদের মরদেহ। খবর বিবিসি ও রয়টার্স।

পুরো ইউরোপের রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে এ ঘটনা। সেইসঙ্গে অভিবাসন ইস্যুতে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আবারো সামনে এনেছে এটি। প্রশ্ন উঠেছে— হঠাৎ করে অভিবাসীদের এ ঢল নামার পেছনে আসল কারণ কী? সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্যের ভাইরাল হওয়া নাকি পরিকল্পিত কোনো চক্রান্ত?

সংকটের সূত্রপাত যেভাবেই হোক না কেন, এ ঘটনার পর স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেশ কয়েকটি দেশের প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বিপদের সময় পাশে না দাঁড়িয়ে কিছু দেশ স্পেনকে নিয়ে রাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছে।

সানচেজের এ ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছেন ইতালি ও দেশটির ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলোনির দল 'ফ্রাতেলি দি ইতালিয়া' সেউতার রাস্তায় অভিবাসীদের ঢলের ছবি পোস্ট করে লিখেছে, এটিই হলো সানচেজ মডেল, যা ইতালির বামপন্থীরা এতো পছন্দ করেন। এর পরপরই নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দেন মেলোনি।

ইতালির এ পদক্ষেপে চরম ক্ষুব্ধ মাদ্রিদ। স্পেনের বক্তব্য স্পষ্ট, সেউতা শেনজেনের অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে সেখান থেকে অনিয়মিত অভিবাসীদের ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের সুযোগ নেই। তাদের দাবি, রাজনৈতিক স্বার্থেই পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করেছেন মেলোনি। আগামী বছরের নির্বাচনে উগ্র অভিবাসনবিরোধী প্রতিপক্ষের কাছে ভোট হারানোর ভয়ে কঠোর অবস্থান দেখাতেই এ পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি।

শুধু ইতালি নয়, স্পেনের বর্তমান অভিবাসন নীতিকে বেশ শিথিল মনে করছে ইউরোপের একাধিক দেশ। মেলোনির আহ্বানে ইউরোপের প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধান আগামী মঙ্গলবার জরুরি বৈঠকের দাবি জানিয়েছেন। এ বৈঠকের মূল লক্ষ্য অভিবাসন প্রত্যাশীদের ইউরোপমুখী করার নীতিগুলো বন্ধ করা। তারা মূলত স্পেনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করছেন, যার মাধ্যমে দেশটিতে থাকা লাখ লাখ নথিহীন অভিবাসীকে বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়েছিল।

স্পেনের সরকারের যুক্তি—দেশটির জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ বৃদ্ধ হচ্ছে এবং কাজের জন্য অভিবাসী প্রয়োজন। তবে সম্প্রতি দেশটির সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়েছে, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের সরাসরি পুশব্যাক করা বা ফেরত পাঠানো যাবে না। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দান, পাচারকারীরা এ রায়কে বিকৃত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেছে, স্পেনের দরজা এখন সবার জন্য খোলা।

সিউতার জনসংখ্যা প্রায় ৮৪ হাজার। সেখানে মাত্র একদিনের মধ্যে ৫০-৬০ হাজার মানুষের প্রবেশ স্পেনের সীমান্ত ব্যবস্থাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছিল। কেউ সাঁতরে, কেউ পাথরের বাঁধ অতিক্রম করে, আবার কেউ সীমান্তের বেড়া টপকে স্প্যানিশ ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েন। সীমান্তরক্ষীদের উপস্থিতি সত্ত্বেও এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রবেশ ঠেকানো যায়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পেন সরকার সিউতার তারাহাল উপকূলে ৫০০ মিটার দীর্ঘ ভাসমান বাধা স্থাপন করে। পানির ওপর ৩০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার উঁচু এবং নিচের দিকে প্রায় এক মিটার বিস্তৃত এ বাধার পাশাপাশি নোঙর করা বয়াও বসানো হয়। স্পেনের সেনা ও পুলিশ সদস্যদেরও সীমান্তে মোতায়েন রাখা হয়েছে।

কেন এ সংকট নতুন করে সামনে এলো? এর উত্তর রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয়। মরক্কোর হাজার হাজার তরুণদের সেউতায় পৌঁছাতে কোনো পাচারকারীকে টাকা দিতে হয়নি। এ পথ তাদের চেনা। তাদের এ পথ পাড়ি দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

এ ঘটনার ঠিক আগে 'স্পেন সবার জন্য উন্মুক্ত'—এমন ক্যাপশন ও ভিডিও ফুটেজ ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে টিকটক ও অন্যান্য মাধ্যমে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে খোলা এসব অ্যাকাউন্টের ভিডিওতে হাজার হাজার 'লাইক' দেখা যায়।

তবে এসব তথ্য ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। সমুদ্রে ভেসে সেউতার তীরে পৌঁছনো তরুণরা দেখেছে ভিন্ন বাস্তবতা। আশ্রয়, খাবার এবং মূল ইউরোপে যাওয়ার কোনো পথ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই মরক্কোয় ফিরতে হয়েছে অধিকাংশকে।

এর অন্যতম কারণ হলো, সিউতায় প্রবেশ করলেও তারা স্পেনের মূল ভূখণ্ড বা ইউরোপের অন্য দেশে যেতে পারেননি। সিউতা স্পেনের অংশ হলেও এখান থেকে মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সময় পরিচয়পত্র, ভিসা ও পুলিশের অতিরিক্ত যাচাইয়ের মুখে পড়তে হয়। ফলে যারা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো তথ্য দেখে ইউরোপে সহজে প্রবেশের আশায় এসেছিলেন, তারা সিউতায় আটকা পড়েন। হাজার হাজার মানুষের জন্য শহরটিতে পর্যাপ্ত খাবার, আশ্রয় বা মৌলিক সেবার ব্যবস্থাও ছিল না। অনেককে রাস্তায় ও সমুদ্রসৈকতে রাত কাটাতে হয়। কয়েকজন অভিবাসী জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে এবং আশ্রয়হীন অবস্থায় থাকার পর তারা স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মরক্কোয় ফেরা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বন্ধুদের বার্তা দেখে তারা উৎসাহিত হয়েছিলেন। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, সীমান্ত অতিক্রম করা সম্ভব। তবে সেউতায় পৌঁছানোর পর স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার কোনো পথ না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়েন।

মরক্কোর ফেজ শহরের এক বেকারি কর্মী ব্রাহিম বলেন, আমরা জীবনযাত্রার উন্নতির আশা নিয়ে গিয়েছিলাম, প্রতারিত হতে নয়। ভিডিও দেখে চাকরি ছেড়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে পৌঁছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখেছি। তিনি জানান, তিন দিন শুধু পানি খেয়ে টিকে ছিলেন, কারণ সেখানে খাবারের দাম ছিল আকাশচুম্বী। একটি টুনা স্যান্ডউইচের দাম চাওয়া হয়েছিল ১০০ দিরহাম।

মরক্কোর সীমান্তবর্তী ফনিদেক শহরে গিয়ে দেখা যায়, সীমান্তমুখী সড়কগুলো এখন অনেকটাই জনশূন্য। গত বৃহস্পতিবার যেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল, সেখানে কয়েকজন তরুণকে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করতে বা হেঁটে ফিরতে দেখা যাচ্ছে। শহরের দোকানপাটও কয়েক দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।

ফিরে আসাদের অভিযোগ, সেউতায় সব দোকানপাট ও সুপারমার্কেট বন্ধ থাকায় তারা খাবার ও পানি পাননি। ভেজা কাপড় শুকানোর জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়েছে। মরক্কোর তাঞ্জের মেড বন্দরের এক কর্মী বলেন, সেউতা একটি কারাগারের মতো হয়ে উঠেছিল, সেখানে করার মতো কিছুই ছিল না।

অভিযোগ উঠেছে, সেউতার প্রধানত মরক্কো-অধ্যুষিত এলাকা এল প্রিন্সিপের বাসিন্দারা অভিবাসীদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। মরক্কোর ওয়েটার ইয়াসিন ইশু জানান, তাকে মারধর করে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। দোকানপাট বন্ধ রেখে তাদের সেউতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

একটি অভিবাসী অভ্যর্থনা কেন্দ্রের ত্রাণকর্মী জানান, কেন্দ্রটি পূর্ণ হয়ে গেছে এবং নতুন কাউকে নেয়ার ক্ষমতা নেই। এখনো হাজার হাজার মানুষ সেখানে রয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। টিটো নামে এক ব্যবসায়ী জানান, বিপুল সংখ্যক মানুষের হঠাৎ আগমনে স্থানীয়রা আতঙ্কিত হলেও অভিবাসী তরুণদের প্রতি তাদের সহানুভূতি রয়েছে। তার মতে, এ তরুণদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে সবার অভিজ্ঞতা এক নয়। মোহাম্মদ আহমেদ নামে ৪৩ বছর বয়সী এক সুদানি অভিবাসী জানান, ট্রাক থেকে নামার পর চার ঘণ্টা সাঁতরে তিনি সেউতায় পৌঁছেছেন। পুলিশ অভিবাসন কেন্দ্রে যাওয়ার পথ আটকে দিলেও তিনি মরক্কোয় ফিরতে নারাজ। তার ভাষায়, আমি ফিরে যাব না, এখানেই চেষ্টা করতে করতে মারা যাওয়া শ্রেয়।

প্রশ্ন উঠছে, এটি কি বেলারুশ সংকটের মতো অভিবাসীদের 'অস্ত্র' হিসেবে ব্যবহার করার কোনো চেষ্টা? এ পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে বিশ্বব্যাপী ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে 'আক্রমণ' ও 'বিপর্যয়' বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইউরোপের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আনন্দ প্রকাশ করছে রাশিয়া। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেকোনো বিভাজন কিয়েভের মিত্রদের দুর্বল করে।

মরক্কো এ ঘটনার জন্য অপরাধী চক্রকে দায়ী করলেও তাদের সীমান্ত রক্ষীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অতীতে ওয়েস্টার্ন সাহারা ইস্যু নিয়ে স্পেনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সময়ও মরক্কো একইভাবে সীমান্ত শিথিল করেছিল। বর্তমান উত্তেজনার মাঝেও সানচেজ মরক্কোকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থেকেছেন, যদিও তার সমালোচকেরা একে দুর্বল কূটনীতি বলে অভিহিত করছেন।

আপাতত সেউতা সীমান্তে কড়া পাহাড়া বসিয়েছে স্পেন। সমুদ্রের ভেতর বেড়া সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাইরের সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর নীতি গ্রহণ নিয়ে আলোচনায় বসবেন।

সাময়িক এ সংকটে নীতিনির্ধারণী জায়গায় হয়তো বড় কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না, তবে ডিজিটাল পর্দার মিথ্যা স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেসব তরুণ সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিল—তাদের অনেকের স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটেছে মরক্কোয় ফেরা কফিনের সারিতে।

আরও