আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

নেতানিয়াহুর শেষ রক্ষা নাকি জোটের হাতবদল?

নেতানিয়াহুবিরোধী জোট পেতে পারে প্রায় ৫২টি আসন। বিপরীতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী জোটের ঝুলিতে যেতে পারে ৫০টি আসন। এ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্যে জয়-পরাজয়ের চেয়েও সংসদে ৬১ আসনের ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করাই এখন সব পক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ

ইসরায়েলে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার অবসানের জোরালো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুবিরোধী জোট কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, শেষ পর্যন্ত কে সরকার গঠন করবেন তা নির্ভর করছে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল এবং পরবর্তী নানা রাজনৈতিক মেরুকরণ ও জোটের সমীকরণের ওপর।

ইসরায়েলি সংসদের (নেসেট) ১২০টি আসনে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশটির আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক জটিল নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে আজ পর্যন্ত কোনো একক দল এককভাবে ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ভোটের পর একাধিক দলের সঙ্গে দরকষাকষি ও সমঝোতার মাধ্যমেই সরকার গঠনের সমীকরণ মেলাতে হয়।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুবিরোধী জোট পেতে পারে প্রায় ৫২টি আসন। বিপরীতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী জোটের ঝুলিতে যেতে পারে ৫০টি আসন। এ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্যে জয়-পরাজয়ের চেয়েও সংসদে ৬১ আসনের ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করাই এখন সব পক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে দেশটির মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ জুড়ে থাকা ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সরকার গঠনে বড় নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর ইসরায়েলে সরকার গঠনের সম্ভাব্য রূপরেখাগুলো হতে পারে নিম্নরূপ:

নেতানিয়াহুর পুনরায় সরকার গঠন

নিজের দল লিকুদ পার্টির নেতৃত্বে আবারও ক্ষমতায় ফিরতে পারেন নেতানিয়াহু। তবে সে ক্ষেত্রে বর্তমান সহযোগীদের পাশাপাশি নতুন কোনো রাজনৈতিক দলের সংসদীয় সমর্থন আদায় করতে হবে তাকে। তার পুরনো মিত্রদের মধ্যে রয়েছে উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম। পাশাপাশি ধর্মীয় ও অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের প্রতিনিধিত্বকারী শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম দল দুটিও সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া এ দল দুটির সঙ্গে পুনরায় সমঝোতা কিংবা নতুন কোনো মিত্র পাশে পেলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ তৈরি হতে পারে।

ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোটের সরকার

নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চারটি বিরোধী দল—ইয়াশার পার্টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস, ইসরায়েল বেইতেনু এবং টুগেদার অ্যালায়েন্স একটি অনাক্রমণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ‘ইসরায়েলকে একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এ জোট ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, তবে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট এবং টুগেদার অ্যালায়েন্সের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট।

‘রাআম’ সমর্থিত সরকার

ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল—জয়েন্ট লিস্ট ও ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাআম) যৌথভাবে প্রায় ১৩টি আসন পেতে পারে বলে জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের সরকারে যোগ দিয়ে ইতিহাস গড়েছিল রাআম। এবারও তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও গাদি আইজেনকটসহ একাধিক বিরোধী নেতা রাআমকে নিয়ে জোট বাঁধার বিপক্ষে।

সংখ্যালঘু সরকার গঠন

কোনো পক্ষই ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে বিরোধী জোট বিকল্প হিসেবে একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে পারে। হাদাশ, তাআল ও বালাদ সমন্বয়ে গঠিত ‘জয়েন্ট লিস্ট’ অনাস্থা ভোটে বিরোধিতা না করার শর্তে বাইরে থেকে এ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পারে। বিনিময়ে তারা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা ও সংগঠিত অপরাধ দমনের মতো নীতিগত শর্ত দিতে পারে। তবে এমন সরকার সবসময় পতন ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে থাকবে।

জাতীয় ঐক্যের সরকার ও পদ ভাগাভাগি

যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক সংকটে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে নিয়ে ‘জরুরি ঐক্যের সরকার’ গঠনের নজির ইসরায়েলে রয়েছে। ২০২০ সালে নেতানিয়াহু ও বেনি গান্তজ এবং ২০২১ সালে বেনেট ও লাপিদ প্রধানমন্ত্রী পদে মেয়ার ভাগাভাগির চুক্তি করে সরকার গঠন করেছিলেন। এমনকি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পরও গান্তজ জরুরি সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। এবারও অচলাবস্থা তৈরি হলে দুই প্রধান নেতার মধ্যে মেয়ার ভাগাভাগির সমঝোতায় জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হতে পারে।

শিবিরের বিকল্প নেতৃত্ব ও নতুন নির্বাচন

সরকার গঠনের আলোচনা আটকে গেলে নেতানিয়াহুর শিবির কিংবা বিরোধী জোট নিজেদের মধ্য থেকে অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিতে পারে। আর যদি কোনো নেতাই প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থন জোগাড়ে ব্যর্থ হন, তবে দেশটি আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়বে। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যেভাবে ৫ বার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, ঠিক তেমনি সমঝোতা না হলে নতুন নির্বাচনের আগপর্যন্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলাবেন।

আরও