মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে: জাতিসংঘ

লাগাতার সংঘাত, সামরিক সহিংসতা এবং ক্রমবর্ধমান সংঘাতকেন্দ্রিক অর্থনীতি মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণকে চরম দুর্দশার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশটির সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—দুই পক্ষই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ, বাধ্যতামূলক শ্রম, যথেচ্ছ আটক ও বাস্তুচ্যুতির মতো অত্যাচার চালিয়েছে।

মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। সেইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মতে, রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন এবং অবৈধ দুর্লভ ধাতু (রেয়ার-আর্থ) উত্তোলন ঘিরে গড়ে ওঠা সংঘাতকেন্দ্রিক অর্থনীতি সেখানকার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। খবর রয়টার্স।

২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সময়কাল তুলে ধরে তৈরি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাগাতার সংঘাত, সামরিক সহিংসতা এবং ক্রমবর্ধমান সংঘাতকেন্দ্রিক অর্থনীতি মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণকে চরম দুর্দশার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশটির সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—দুই পক্ষই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ, বাধ্যতামূলক শ্রম, যথেচ্ছ আটক ও বাস্তুচ্যুতির মতো অত্যাচার চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো পক্ষই রয়টার্সের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হয়নি।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গার দেশত্যাগের ৯ বছর পরও এবং ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হওয়া নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় এই সম্প্রদায়টি এখনো পদ্ধতিগত বৈষম্যের শিকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে সামরিক বাহিনী আতঙ্ক ছড়াতে এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বিমান হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ত্রাণ সরবরাহে বিধিনিষেধের ওপর নির্ভর করে চলেছে। ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৮ হাজার ৭৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১ হাজার ৭৭৪ জন নারী এবং ১ হাজার ৭৪ জন শিশু রয়েছে। তবে জাতিসংঘের ধারণা, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। অবশ্য মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দাবি, বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর শহর-গ্রাম দখলের জবাবে তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই সীমিত বিমান হামলা চালিয়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, র্তমানে দেশটিতে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৩৬ লাখে পৌঁছেছে। এছাড়া ১ কোটি ২৪ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখোমুখি এবং প্রায় ৪ লাখ মা ও শিশু চরম পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।

উত্তর রাখাইনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের যথেচ্ছ গ্রেফতার, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, বাধ্যতামূলক শ্রম ও জমি দখলের অভিযোগ এনেছে জাতিসংঘ। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজস্ব ভিটে-মাটিতে ফিরতে বাধা দিয়ে সেখানে অ-রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, প্রায় ২ হাজার একর জমি দখল করা হয়েছে। ছয় বছরের ছোট শিশুদেরও শ্রমে বাধ্য করা হচ্ছে এবং হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

এছাড়া কাচিন ও শান রাজ্যে অবৈধ দুর্লভ ধাতু উত্তোলনের দ্রুত প্রসারের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ২০২১ সালের পর থেকে কাচিনে ৩০২টি এবং শান রাজ্যে অভ্যুত্থানের আগের ১২টির জায়গায় বর্তমানে ৮৫টি নতুন খনি এলাকা গড়ে উঠেছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, দুর্লভ ধাতুর অবৈধ বাণিজ্য ২০২৩ সালে আনুমানিক ১৪০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল, যার বড় অংশই গেছে চীনের বাজারে। এসব খনির বিষাক্ত বর্জ্য জলপথ ও ফসলি জমি দূষিত করায় স্থানীয়দের মধ্যে গর্ভপাত ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের হার বেড়েছে। এমনকি এ দূষণ থাইল্যান্ডে প্রবাহিত নদীগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার পানিতে উচ্চ মাত্রায় আর্সেনিক, সিসা, পারদ ও ম্যাঙ্গানিজ পাওয়া গেছে।

আরও